সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

পরিবারের শেষকৃত্যের ১০ দিন পর কাদা চাপা বাড়ি থেকে ৬৪ বছরের বৃদ্ধা জীবিত উদ্ধার

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও প্রলয়ঙ্কারী ভূমিধসের ১১তম দিনে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অলৌকিকভাতে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৬৪ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মৃত ধরে নিয়ে যখন প্রতীকী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করছিলেন, ঠিক তখনই নিখোঁজের ১০ দিন পর নুওয়াকোট জেলার বেত্রাবতীতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে থাকা একটি বাড়ির ওপরের তলা থেকে চন্দিকা কুমারী শ্রেষ্ঠা নামের ওই নারীকে অচেতন কিন্তু জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। প্রলয়ঙ্কারী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপুল প্রাণহানির মাঝে এই উদ্ধারের ঘটনাকে এক অলৌকিক সংকেত ও নতুন আশার আলো হিসেবে দেখছেন উদ্ধারকারীরা।গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক অতিবৃষ্টির ফলে বোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় শতাব্দীর ভয়াবহতম বন্যা ও ভূমিধস সৃষ্টি হয়। পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে নদীর পাড়ের বিস্তীর্ণ জনপদ মুহূর্তেই কাদা ও বিশাল পাথরের নিচে বিলীন হয়ে যায়। ঐ দিন নুওয়াকোট জেলার বেত্রাবতীর নিজের বাড়ি থেকে পরিবারের অন্য চার সদস্যের সঙ্গে নিখোঁজ হন চন্দিকা কুমারী শ্রেষ্ঠা।টানা আট দিন ধরে খোঁজাখুঁজির পরও কোনো সন্ধান না পেয়ে চন্দিকার পরিবার আশা ছেড়ে দেয়। নেপালি সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, মরদেহ না পাওয়া গেলে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করে কুশ ঘাস দিয়ে প্রতীকী শবদেহ তৈরি করে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিলেন স্বজনরা।তবে গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সশস্ত্র পুলিশের এক উদ্ধারকারী দল যখন বেত্রাবতীর ওই পলি ও কাদায় ঢাকা এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছিল, তখন তারা একটি ধসে পড়া চারতলা ভবনের ভেতর থেকে অতি ক্ষীণ কান্নার শব্দ শুনতে পান। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চারতলা বাড়িটি মূল স্থান থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে ভেসে গিয়ে এক ভয়াবহ কাদা ও বালুর চোরাবালির মতো খাদে আটকে ছিল। ভবনটির নিচের সাড়ে তিন তলাই কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে যাওয়া কাদায় সম্পূর্ণ বুজে গিয়েছিল।শব্দ শোনার পর ৯ সদস্যের সশস্ত্র পুলিশ টিম দ্রুত অভিযানে নেমে জানালার গ্লাস ভেঙে কাদা সরিয়ে বাড়ির ওপরের তলায় প্রবেশ করে। সেখানে প্রায় অর্ধেক শরীর কাদা ও আবর্জনায় চাপা পড়া অবস্থায় চন্দিকাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারীরা জানান, তিনি একটি সংকীর্ণ ফাঁকা স্থানে (Air pocket) আটকে ছিলেন, যা তাঁকে নিঃশ্বাস নিতে এবং অলৌকিকভাবে এত দিন টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে নেপাল সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে তাঁকে রাজধানী কাঠমান্ডুর বীরেন্দ্র মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।টানেল থেকেও মিলছে প্রাণের সাড়া:একই দিনে নেপালের রাশুয়া জেলায় আরেকটি রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান সফল হয়েছে। সেখানকার 'আপার ত্রিশূলী-১' জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি দীর্ঘ সুড়ঙ্গে ২২৫ মিটার ভেতরে টানা ১০ দিন আটকে থাকার পর লু হাইতাও নামের এক চীনা নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। নেপালি সেনাবাহিনী ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা দল যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। এর দুদিন আগে 'আপার ত্রিশূলী-৩এ' জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্য একটি সুড়ঙ্গ থেকেও দুই নেপালি শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল।উপমহাদেশে জলবায়ু বিপর্যয় ও প্রাণহানির চিত্র:দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয় চেপে বসছে। এই আকস্মিক দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক খেটে খাওয়া মানুষ ও সাধারণ নাগরিক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নেপাল সরকারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই বন্যা ও ধসে কেবল নেপালেই মৃতের সংখ্যা ১,৩৪২ ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৫,০০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। সীমান্তে তিব্বত অঞ্চলেও প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩ জন এবং নিখোঁজ শতাধিক। উদ্ধারকারী দলগুলো এখন তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে, এবং মৃতদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে।স্বজনহারা অগণিত পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদের মাঝে চন্দিকা কুমারী শ্রেষ্ঠা ও আটকে পড়া শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধার হওয়ার খবর নিখোঁজদের স্বজনদের মনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে।

পরিবারের শেষকৃত্যের ১০ দিন পর কাদা চাপা বাড়ি থেকে ৬৪ বছরের বৃদ্ধা জীবিত উদ্ধার