গরুর গোশত রান্নায় যুবককে জুতোর মালা ও গোবর ঢেলে চরম লাঞ্ছনা: নীরব দর্শকের ভূমিকায় পুলিশ
ভারতের ওড়িশা রাজ্যে তথাকথিত ‘গো-রক্ষক’দের হাতে এক দলিত যুবককে জনসমক্ষে জুতোর মালা পরিয়ে ও মাথায় গোবর ঢেলে চরমভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে। গরুর গোশত রান্নার অভিযোগে উগ্রবাদীদের এই বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ ও ঘটনাস্থলে পুলিশের নির্লিপ্ততা নিয়ে ভারতজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে।স্বঘোষিত গো-রক্ষকদের দাবি, সংশ্লিষ্ট দলিত যুবকটি জনসমক্ষে বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতা আঘাত করে গরুর গোশত প্রস্তুত করছিলেন। কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর স্থানীয় সমর্থকদের মতে, গো-হত্যা বা গরুর গোশত ভক্ষণ তাদের ধর্মীয় অনুভূতির পরিপন্থী এবং তারা একে আইনি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, হিন্দুত্ববাদী জনতা ওই ব্যক্তির সামনে কিছু কাঁচা মাংস রেখে সেটিকে ‘গোমাংস’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে। অভিযুক্তদের দাবি, তারা এলাকাকে ‘পবিত্র’ রাখতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধ করতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে ঘটনার সময় উপস্থিত জনতার আচরণে বিচারপ্রক্রিয়ার চেয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ও বিদ্রূপাত্মক মানসিকতা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ওড়িশার কালাহান্ডি জেলার ভবানীপাটনা শহরে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একজন দলিত যুবককে মাটিতে বসিয়ে গলায় জুতোর মালা পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত লোকজন তাকে ঘিরে উপহাস করছে এবং ভিডিও ধারণ করছে।চিত্রগুলোতে আরও দেখা যায়:এক ব্যক্তি যুবকের মাথায় একটি স্টিলের পাত্র চাপিয়ে দেয়, যা দেখে উপস্থিত জনতা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।অন্য এক ব্যক্তি তার মুখে সাদা ধুলো বা পাউডার ছিটিয়ে দেয়।এর পরপরই এক ব্যক্তি বালতিভর্তি গোবর মিশ্রিত তরল ওই যুবকের মাথায় ও শরীরে ঢেলে দেয়।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভিডিওতে একজন দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাকে দাঁড়িয়ে সব দেখতে পাওয়া গেলেও তাকে কোনো পদক্ষেপ নিতে বা যুবকটিকে উদ্ধার করতে দেখা যায়নি। উড়িষ্যা প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অমিয় পাণ্ডব এই ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে সরাসরি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বজরাঙ্গ দল’-এর বিরুদ্ধে এই হামলার অভিযোগ তুলেছেন। আক্রান্ত যুবকের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।ভারতের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনো ধরনের অস্পৃশ্যতা বা দলিত-নিপীড়ন দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া ‘তফসিলি জাতি ও উপজাতি (নির্যাতন প্রতিরোধ) আইন, ১৯৮৯’ অনুযায়ী এই ধরনের লাঞ্ছনা ও সামাজিক বয়কট অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, গো-রক্ষার নামে ভারতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও শারীরিক লাঞ্ছনা নাগরিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই ঘটনায় পুলিশের নীরবতা ‘কর্তব্যে অবহেলা’ এবং ‘সহযোগিতা’র নামান্তর, যা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকলেও তাকে বিচারের আওতায় আনার দায়িত্ব প্রশাসনের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, এই ঘটনায় জড়িতদের এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় এ ধরনের সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষ সমাজের ভিত্তিকে ধসিয়ে দিতে পারে।