১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে জেরুসালেমের পতন ঘটে এবং উসমানীয় (অটোমান) সেনাবাহিনী শহরটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। তবে পবিত্র মসজিদে আকসার সুরক্ষা এবং স্থানীয় মুসলমানদের আস্থা বজায় রাখতে একদল উসমানীয় সেনাকে সেখানে 'আর্টচি বির্লিক' বা পশ্চাৎবর্তী প্রহরী হিসেবে রেখে যাওয়া হয়। সেই দলেরই সদস্য ইগদিরের অনবাশি (কর্পোরাল) হাসান কম্যান্ডারের দেওয়া শেষ আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে টানা ৬৫ বছর—১৯৮২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত—স্বেচ্ছায় আল-আকসার পাহারা দিয়ে যান। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং আল-আকসায় তার এই ঐতিহাসিক ও অনন্য ত্যাগের ঘটনা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চিরন্তন প্রেরণার উৎস।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে উসমানীয় সাম্রাজ্য যখন ভেঙে পড়ছিল, তখন ১৯১৭ সালে জেরুসালেম দখল করে ব্রিটিশ বাহিনী। সুয়েজ খাল ফ্রন্টে পরাজয়ের পর উসমানীয় ২০তম কোর ঐতিহাসিক এই পবিত্র নগরী ফাঁকা করার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে জেরুসালেমের পবিত্র স্থানগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। ৮ ডিসেম্বর ১৯১৭-এ শহরটির আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর ঘটলেও উসমানীয় বাহিনীর তোকাটের ক্যাপ্টেন মুস্তাফার অধীনে ৫৩ জনের একটি বিশেষ সেনাদলকে সেখানে রেখে যাওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল—নতুন শাসনব্যবস্থা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত শহরের নিরাপত্তা রক্ষা, বিশৃঙ্খলা রোধ এবং আল-আকসায় মুসলিম শাসনের প্রতীকী উপস্থিতি ধরে রাখা।বিদায়বেলায় প্লাটুন কমান্ডারের ঐতিহাসিক নির্দেশ ছিল: 'কুদস (জেরুসালেম) সুলতান সেলিম খানের আমানত। তোমরা এখানে পাহারা জারি রাখো, যেন জনগণ মনে না করে উসমানীয়রা চলে গেছে। আমরা যদি প্রথম কিবলাকে এভাবে ফেলে যাই, তবে শত্রুরা আনন্দিত হবে। ইসলামের মর্যাদা রক্ষা করো।'সেই আদেশ মাথায় নিয়ে অনবাশি হাসান এবং তার সহযোদ্ধারা থেকে যান কুদসে। সময়ের পরিক্রমায় বছরের পর বছর পার হতে থাকে, হাসান বাদে তার বাকি ৫২ জন সহযোদ্ধা বার্ধক্য ও রোগে একে একে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু হাসান পিছু হটেননি। পুরো জেরুসালেমে তিনি ছিলেন একমাত্র উসমানীয় সৈনিক, যিনি একাকী তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন।আল-আকসার খতিব শায়খ ইকরিমা সাবরি জানান, ১৯৮২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বৃদ্ধ হাসান প্রতিদিন ছোপ ছোপ তালি দেওয়া পুরনো সামরিক ইউনিফর্ম পরে ফজরের আগেই মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং এশার নামাযের পর সবার শেষে বের হতেন। হারাম আল-শরীফের উত্তর দিক থেকে কুব্বাতুস সাখরা (ডোম অব দ্য রক)-এর দিকে উঠে যাওয়া সিঁড়ির মাথায় প্রতিদিন নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি।১৯৭২ সালে তুর্কি সাংবাদিক ইলহান বারদাকচি আল-আকসা পরিদর্শনের সময় ৯০ বছর বয়সী এই বীর প্রহরীর সন্ধান পান। তিনি সামরিক কায়দায় নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন: "আমি ২০তম কোর, ৩৬তম ব্যাটালিয়ন, ৮ নম্বর কোম্পানির হেভি মেশিনগান টিমের কর্পোরাল হাসান।" বারদাকচি তুরস্কে ফিরে হাসানের কমান্ডারের খোঁজ করলেও জানতে পারেন তিনি আগেই মারা গেছেন। এর ১০ বছর পর, ১৯৮২ সালে, বারদাকচির কাছে একটি তারবার্তা আসে—"মসজিদে আকসার শেষ উসমানীয় প্রহরী আজ ইন্তেকাল করেছেন।"যদিও তার নির্দিষ্ট কবরের স্থান জানা যায়নি, তবে তিনি জেরুসালেমের পবিত্র মাটিতেই শায়িত আছেন। তাঁর অসাধারণ ত্যাগ ও ইমানের স্মরণে ২০১৭ সালে ফিলিস্তিনের গাজায় আইএইচএইচ (IHH) মানবিক সহায়তা সংস্থা একটি মসজিদ নির্মাণ করে, যার নামকরণ করা হয় 'অনবাশি হাসান মসজিদ'।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।