ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দেহরাদুনের সেওলা কালান এলাকায় অবস্থিত একটি স্থানীয় মসজিদে চলমান গ্রাউটিং (পানি পড়া রোধের কাজ) বন্ধ করে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরাঙ্গ দলের সদস্যরা। সংগঠনটির উত্তরাখণ্ড রাজ্য সভাপতি বিকাশ ভার্মার নেতৃত্বে একদল উগ্রপন্থী উস্কানিমূলক স্লোগান দেয় এবং পুরো মসজিদ ভবনটি সিলগালা করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করে।বজরাঙ্গ দলের নেতা বিকাশ ভার্মা দাবি করেন, মসজিদটির আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও এটি তিন তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে মসজিদ ভবনটি রাস্তা দখল করে তৈরি করা হয়েছে এবং স্থানীয় হিন্দুদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। মসুরি-দেওবঁদ/দেহেরাদুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এমডিডিএ)-র কাছে তাৎক্ষণিক তদন্ত ও মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি জানায় উগ্রপন্থী এই দলটি।তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন 'মুসলিম সেবা সংগঠন' এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনের সভাপতি নাঈম কুরেশি এবং সহ-সভাপতি আকিব কুরেশি নিশ্চিত করেছেন যে, সেখানে কোনো নতুন বা অবৈধ নির্মাণ কাজ হচ্ছিল না। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের ছাদের স্ল্যাব দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছিল, যা ভবনের ক্ষতি করছিল। সেই পানি পড়া বন্ধ করতেই সাময়িক সংস্কার ও গ্রাউটিং-এর কাজ চালানো হচ্ছিল।মুসলিম সেবা সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আরও জানান, মসজিদটি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া মেনে নির্মিত এবং এর সমস্ত বৈধ কাগজপত্র ও অনুমতিপত্র আগেই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর এই আইন হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা মূলত স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়কে হয়রানি করা এবং ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়ানোর একটি অপচেষ্টা।ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আননে এমডিডিএ (MDDA)-র কর্মকর্তা, স্থানীয় পুলিশ এবং পৌর কর্পোরেশনের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এমডিডিএ সচিব মোহন সিং বেরনিয়া জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ ও ক্ষোভঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সরকারি কোনো নির্দেশ বা আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া কীভাবে একটি বেসরকারী উগ্রপন্থী গোষ্ঠী কোনো উপাসনালয়ে তাণ্ডব চালায় এবং সিলগালা করার হুমকি দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা।সামাজিক মাধ্যম 'এক্স' (টুইটার)-এ এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'এরা কেবল ঘৃণা ছড়াচ্ছে এবং অহেতুক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করছে। অননুমোদিত নির্মাণের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ সরকারি কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখবে। তা পরিদর্শন বা সিলগালা করার ক্ষমতা কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রয়েছে, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নয়।'অন্য এক ব্যবহারকারী উত্তরাখণ্ড পুলিশকে ট্যাগ করে লিখেছেন, 'দাঙ্গা উসকে দেওয়া সংগঠন বজরাঙ্গ দল কি মসজিদে ঢুকে এভাবে উস্কানি দিয়ে দাঙ্গা বাঁধাতে চায়? অন্য কোনো ধর্মের মানুষ যদি মন্দিরে গিয়ে এমন আচরণ করত, তবে তাদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ (UAPA) বা এনএসএ-র মতো কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হতো। তাহলে এই দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?'ভারতে দিন দিন সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপাসনালয় ও নাগরিক অধিকারের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর হামলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে চরমপন্থী সংগঠনগুলোর এমন বেপরোয়া আচরণ ভারতের সংবিধান ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।