রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

কালীঘাটে মাছ খেলেন শুভেন্দু: নিরামিষ আপত্তি উড়িয়ে দিল বাঙালি সংস্কৃতি

আসন্ন দুর্গাপূজা ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে মাংশ-মাছ না খাওয়ার জন্য ভারতের মধ্যপ্রদেশের বিতর্কিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রচারক ‘বাগেশ্বর ধাম’-এর প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাঙালি সনাতনীদের ওপর একটি বিতর্কিত আপত্তি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে তীব্র গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হলে বিজেপি চরম ব্যাকফুটে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে কলকাতার ঐতিহাসিক কালীঘাট মন্দিরে উপস্থিত হয়ে দেবী কালীকে নিবেদিত ঐতিহ্যবাহী ইলিশ-মাছের ভাজা, রুইয়ের মুড়ো ও বাসন্তী পোলাও ভোগ প্রকাশ্যে গ্রহণ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।আপত্তি বনাম সংস্কৃতি: হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার মুখোমুখি বাঙালি সনাতনী সমাজভারতের উত্তর ও মধ্য ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর প্রধান লক্ষ্য হলো তাদের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস ও কঠোর নিরামিষাশী হিন্দুত্ববাদী মডেল পুরো ভারতের বহুমাত্রিক সংস্কৃতির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার লিলুয়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা বিতর্কিত হিন্দুত্ববাদী ধর্মগুরু ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী (বাগেশ্বর বাবা) দাবি করেন, দুর্গাপূজার সময় বাঙালি হিন্দুদের মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করা উচিত। শুধু তা-ই নয়, যারা পূজার দিনে মাছ বা মাংস খাবে, তাদেরকে তিনি ‘পাষণ্ড’ বা ‘ভণ্ড’ (পাখন্ডি) এবং তাদের খাবারকে ‘নোংরা’ বলে আখ্যা দেন।এই মন্তব্যের পর সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী গ্রুপ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ তোলে যে, উত্তর ভারতীয় হিন্দি-বলয়ের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ দিয়ে স্থানীয় বাঙালি মুসলমানদের পাশাপাশি বাঙালি হিন্দু সমাজকেও কোণঠাসা ও নিয়ন্ত্রণ করার একটি চক্রান্ত চলছে।কালীঘাটে শুভেন্দুর মাছ ভোগ গ্রহণ এবং বিজেপির দ্বিমুখী অবস্থানউত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের সাথে বাঙালি লোকজ সংস্কৃতির এই সরাসরি সংঘাত রুখতে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী চরম সংকটে পড়েন। কারণ উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে তোষণ করতে গিয়ে তারা বহুসংখ্যক বাঙালি ভোটারের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছিলেন।বৃহস্পতিবার কৌশিকী অমাবস্যার পবিত্র তিথিতে শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে হাজির হন। তিনি সেখানে ঐতিহ্যবাহী বেনারসি শাড়ি ও ফুল দিয়ে পূজা নিবেদন শেষে মেঝেতে বসে মন্দিরের পুরোহিতদের তৈরি ‘মাছের মাথা, মাছ ভাজা এবং বাসন্তী পোলাও’-এর ভোগ প্রকাশ্যে গ্রহণ করেন।সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "কোনো সাধু বা ধর্মগুরু নিজের ব্যক্তিগত মতামত দিতেই পারেন। কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমরা আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য অনুসরণ করি। কালীঘাট ও তারাপীঠে মা কালীকে মাছ ও ছাগল বলির মাংস নিবেদন করাই শাস্ত্রীয় প্রথা। আমি নিজে মহাঅষ্টমীতে বা কার্তিক মাসে সাত্ত্বিক (নিরামিষ) আহার করি, কিন্তু দেবীর প্রসাদ হিসেবে মাছ ও মাংস গ্রহণ করতে আমাদের কোনো বাধা নেই।"বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও তাদের অনুসারী চরমপন্থী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য-ফ্যাসিবাদ (Food Fascism) চালনা করছে। ইতিপূর্বে তারা মুসলিম ও নিম্নবর্ণের দলিত জনগোষ্ঠীর গরুর মাংস খাওয়া ও ব্যবসার ওপর হামলা চালিয়েছে, পিটিয়ে মানুষ হত্যা করেছে। এখন সেই একই উগ্রতা ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী অ-হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীগুলোর ওপরও।পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করতে তারা বাঙালি সমাজের শতবর্ষী বৈচিত্র্যময় লোকজ ও খাদ্যাভ্যাস কেন্দ্রিক ঐতিহ্যকেও নিরামিষাশী কাঠামোতে রূপান্তর করতে চাইছে। কিন্তু কালীঘাটের মন্দিরে খোদ শুভেন্দু অধিকারীর মাছের ভোগ গ্রহণ প্রমাণ করে—পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী চাপিয়ে দেওয়া আপত্তি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে চরমপন্থীরাও।

কালীঘাটে মাছ খেলেন শুভেন্দু: নিরামিষ আপত্তি উড়িয়ে দিল বাঙালি সংস্কৃতি