কিরগিজস্তানের ঐতিহাসিক ওশ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুলাইমান পাহাড় কেবল ভৌগোলিক সৌন্দর্য নয়, বরং মধ্য এশিয়ার মুসলিম ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। মহান পরাক্রমশালী মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর তাঁর দূরন্ত যৌবনে আধ্যাত্মিক চর্চা ও প্রার্থনার জন্য এই পাহাড়ের চূড়ায় একটি ক্ষুদ্র হুজরা নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে সোভিয়েত আমলে ১৯৬৩ সালে এটি ধ্বংস করা হলেও, আশির দশকের শেষে স্থানীয় মুসলিমদের অভূতপূর্ব স্বেচ্ছাশ্রম ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ইতিহাসকে আবার বাঁচিয়ে তোলা হয়। ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের ওপর অবস্থিত এই পবিত্র স্থানটি আজও তুর্কিস্তানের সমৃদ্ধ ইসলামী স্থাপত্য ও সংস্কৃতির নীরব সাক্ষী।মধ্য এশিয়ার সুলাইমান পর্বত ও বাবরের স্মৃতিকিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে তিয়েন শান (তানরি) ও পামির পর্বতমালার মধ্যবর্তী বিখ্যাত ফারগানা উপত্যকায় অবস্থিত তিন হাজার বছরের প্রাচীন শহর ওশ। এই প্রাচীন শহরের একদম কেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে 'সুলাইমান পাহাড়' বা 'তখত-ই-সুলাইমান'। স্থানীয় জনশ্রুতি ও প্রাচীন ইতিহাস অনুসারে, হযরত সুলাইমান (আ.) ওশ শহর সফরকালে এই উচ্চ শিখরে উঠে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন। প্রাচীনকাল থেকেই পবিত্র বলে গণ্য করা এই পর্বতটি শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের জন্য ঈমান ও ঐতিহ্যের এক গভীর প্রতীক। ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় শতাব্দী ধরে এটি বিশ্ববাণিজ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির সেতুবন্ধন হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।সুলাইমান পাহাড়ের অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন, ঝরনা ও গুহা। পুরো পাহাড়জুড়ে ছোট-বড় সরু পথ দিয়ে যুক্ত প্রায় ১৭টি ইবাদতগাহ বা প্রার্থনাস্থল রয়েছে, যেখানে শতাব্দী ধরে মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষ আধ্যাত্মিক প্রশান্তির খোঁজে সমবেত হন।মুঘল প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ও 'তখত-ই-সুলাইমান'এই সুলাইমান পাহাড়ের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ অবকাঠামোটি হলো তিমুর বংশোদ্ভূত বীর যোদ্ধা ও পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের একটি প্রার্থনাকক্ষ বা হুজরা। এটি 'তখত-ই-সুলাইমান মসজিদ' নামেও সুপরিচিত।১৪৯৬ থেকে ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে, যখন বাবর ছিলেন এক উদীয়মান যুবক ও শাসক, তখন তিনি এই স্থানে আধ্যাত্মিক সাধনা, নির্জন ইবাদত ও বিশ্রামের জন্য একটি ছোট ইবাদতখানা নির্মাণ করেন। ফারগানা উপত্যকার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে নির্জনতায় স্রষ্টার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই স্থাপনাটিকে স্থানীয় জনগণ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে 'বাবরের ঘর' (House of Babur) বলে অভিহিত করে থাকে। নিখুঁত ইট ও অনন্য স্থাপত্যরীতির এই হুজরাটি তুর্কিস্তানের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন।সোভিয়েত আগ্রাসন ও ধ্বংসের কালো থাবামধ্য এশিয়ার হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার যে নীতি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন গ্রহণ করেছিল, তার আঁচ পড়েছিল এই ঐতিহাসিক হুজরার ওপরও। ১৯৬৩ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষ "ভূমিকম্পের ঝুঁকি" ও নিরাপত্তার বাহানা তুলে শত শত বছরের পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী 'বাবরের ঘর'টি গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু ইট-পাথরের স্থাপনা ভেঙে ফেলা গেলেও স্থানীয় মুসলমানদের হৃদয় থেকে বাবরের স্মৃতি এবং তাদের ইসলামী ঐতিহ্যের গভীর টান মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।জনগণের ঐক্য ও পুনর্নির্মাণের বিস্ময়কর গল্প১৯৮৬ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হলে কিরগিজ রিস্টোরেশন রিসার্চ অ্যান্ড ডিজাইন ব্যুরো ঐতিহাসিক এই স্থানটি পুনর্নির্মাণের একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে। উজবেকিস্তানের বুখারা ও খিভা অঞ্চল থেকে আসা অভিজ্ঞ কারিগরদের তত্ত্বাবধানে নিখুঁতভাবে হুজরাটি পুনর্নির্মাণের নকশা প্রস্তুত করা হয়।১৯৮৯ সালের গ্রীষ্মে শুরু হয় এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। নিজেদের ঈমানী ঐতিহ্য ও ইতিহাস পুনরুদ্ধারে স্থানীয় আপামর মুসলিম জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। সুলাইমান পাহাড়ের খাড়া উত্তর ঢালে হাজার হাজার মানুষ হাতে হাত মিলিয়ে এক বিশাল 'মানব শিকল' (Human Chain) গড়ে তোলেন। পাহাড়ের নিচ থেকে ইট, চুন, সুরকি ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী একজন থেকে আরেকজনের হাতে হস্তান্তরিত হয়ে একদম পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যায়। জনগণের এই অভূতপূর্ব ভালোবাসা, শ্রম ও ঐক্যের মাধ্যমে ১৯৯১ সালের মধ্যে হুজরাটি পুনরায় তার পূর্বের মহিমায় আত্মপ্রকাশ করে।আজও চমৎকার ইটের কাজ এবং নিজস্ব স্থাপত্য সৌন্দর্য নিয়ে 'বাবরের ঘর' ও সুলাইমান মসজিদ মধ্য এশিয়া তথা পুরো বিশ্ব মুসলিমের কাছে নিজেদের অদম্য আস্থার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।