রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

ভারতে মুসলিম নারীকে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীর হেনস্তা, গঙ্গায় অন্য হিন্দুদের কাপড় ধোয়ায় নীরবতা

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের হরিদ্বারে পবিত্র গঙ্গা নদীর পাড়ে এক মুসলিম নারীকে চরমভাবে হেনস্তা ও উগ্র আচরণের শিকার হতে হয়েছে। এক কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী কর্মী ওই নারীকে গঙ্গায় কাপড় ধোয়ার অপরাধে অভিযুক্ত করে হুমকি দেয়, অথচ একই সময়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে একাধিক হিন্দু পুরুষকে স্বাধীনভাবে নদীতে কাপড় কাচতে দেখা গেলেও তাদের কিছুই বলা হয়নি। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) এই বর্ণবাদী ও পক্ষপাতমূলক আচরণের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ছত্রছায়ায় মুসলিমদের ওপর প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও হেনস্তা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর সর্বশেষ নজির দেখা গেল উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে।ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, এক মুসলিম নারী যখন নদীপাড়ের চত্বর থেকে তার বালতিভর্তি ধোয়া কাপড় নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন একজন স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী এবং তার সহযোগী ওই নারীর পথরোধ করে। উগ্র ভঙ্গিতে হিন্দি ভাষায় তাকে ধমক দিয়ে বলা হয়, "তেরেকো মানা কিয়া থা না কাপড়ে গঙ্গাজি মে নেহি ধোনে হ্যায়" (তোমাকে বারণ করা হয়েছিল না যে গঙ্গাজিতে কাপড় ধোবে না?)।উক্ত হিন্দুত্ববাদী কর্মী অভিযোগ করে যে, বারবার সতর্ক করার পরও ওই নারী পবিত্র নদীতে কাপড় ধুয়েছেন। শুধু তাই নয়, সে গঙ্গার পবিত্রতা রক্ষার অজুহাত ছাপিয়ে মুসলিমদের প্রতি তার জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষ উগড়ে দেয়। সে দাবি করে, "এদের মতো মানুষ" (মুসলিমরা) সেখানে ঝুপড়ি বা অস্থায়ী বসতি তৈরি করে চারপাশ নষ্ট করছে এবং পুণ্যার্থীদের জিনিসপত্র চুরি করছে। এরপর চূড়ান্ত হুমকি দিয়ে সে বলে, "সারা কাম করতে হ্যায় তুম। আজ কে বাদ মিল জানা ইহা পে" (সব ধরণের অপকর্ম তোমরাই করো। আজকের পর যেন তোমাকে আর এখানে দেখা না যায়)।দ্বিমুখী নীতি ও প্রকাশ্য বৈষম্যআশ্চর্যের বিষয় হলো, একই ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড বা পেছনের দৃশ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বেশ কয়েকজন হিন্দু পুরুষ নদীর পানিতে প্রকাশ্যে তাদের ব্যবহৃত কাপড় চিপছেন, ঘষছেন এবং কাচছেন। কিন্তু ডানপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী ওই কর্মীরা তাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি বা কোনো ধরনের চিৎকার-চেঁচামেচি করেনি। এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, বিষয়টি কোনো পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা বা নদীর পবিত্রতা রক্ষার তাগিদ থেকে করা হয়নি; বরং কেবল একজন মুসলিম নারীকে নিশানা করে তাকে হেনস্তা ও এলাকা ছাড়া করার উদ্দেশ্যেই এই নাটক সাজানো হয়েছিল।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার পর ব্যাপক মিশ্র ও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কিছু কট্টরপন্থী হিন্দু ব্যবহারকারী এই হেনস্তাকে সমর্থন করে দাবি করেছে যে, "হিন্দুরা মক্কায় গিয়ে শুকরের মাংস নিয়ে মুসলিমদের উত্যক্ত করে না।" তবে মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ ব্যবহারকারীরা এই অযৌক্তিক যুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, সমস্যাটি পরিচ্ছন্নতা বা ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে নয়, বরং এটি স্পষ্ট ধর্মীয় নিপীড়ন ও মুসলিম বিদ্বেষ, কারণ একই অপরাধে লিপ্ত অন্য কোনো হিন্দু পুরুষকে সেখানে বাধা দেওয়া হয়নি।ধারাবাহিক মুসলিম নিগ্রহউত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের কট্টরপন্থী দলগুলো দীর্ঘ দিন ধরে গঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের জীবিকা ও চলাচলের ওপর অনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করে আসছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।চলতি বছরের মার্চ মাসে (পবিত্র রমজান মাসে) ১৪ জন তরুণের একটি দল নৌকায় বসে পার্টি করার সময় চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল। একজন স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী নেতার দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পুলিশ তাদের আটক করে, যেখানে অভিযোগ ছিল—পবিত্র পানিতে নিরামিষ ছাড়া অন্য খাবার খাওয়া তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। ওই মুসলিম তরুণদের জামিন পেতে দীর্ঘ দুই মাস সময় লেগেছিল।অনুরূপভাবে, গত ২৫ জুন বারাণসীতে গঙ্গা নদীতে নৌকার ওপর মদ ও মুরগির মাংস দিয়ে পার্টি করার অপরাধে পাঁচ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু মার্চ মাসের ঘটনার সাথে এর মূল পার্থক্য ছিল—এই পাঁচজন মুসলিম ছিলেন না। ফলে আশ্চর্যজনকভাবে, গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তারা জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। ভারতের বিচার ব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব ও দ্বিমুখী আচরণ দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ভারতে মুসলিম নারীকে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীর হেনস্তা, গঙ্গায় অন্য হিন্দুদের কাপড় ধোয়ায় নীরবতা