যুক্তরাষ্ট্র দখল করছে মুসলমানরা — ইহুদিবাদী লবির দাবিকে ‘ডাহা মিথ্যা’ ও ‘ভীতি ছড়ানোর অপচেষ্টা’ বলল কেয়ার
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ মুসলিম মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সংস্থা ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ (CAIR) ইহুদিবাদী লবির একটি উস্কানিমূলক দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন, মনগড়া ও সাজানো মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সম্প্রতি জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত এক নীতি নির্ধারণী সম্মেলনে ‘হেরুত ইসরায়েল ফ্রিডম সেন্টার’-এর সিইও আমিয়াদ কোহেন দাবি করেন, মুসলিম ব্রাদারহুড ও কেয়ারের মাধ্যমে মুসলমানরা আমেরিকার ফ্লোরিডা ও টেক্সাসসহ পুরো দেশ দখল করার ষড়যন্ত্র করছে। এই ইসলামোফোবিক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে কেয়ার নিউ জার্সির পরিচালক সালাহউদ্দিন মাকসুদ বলেছেন, মার্কিন সমাজ ও রাজনীতিতে মুসলিমদের বৈধ অংশগ্রহণ এবং মানবাধিকারের পক্ষে সাধারণ মার্কিনিদের জাগরণকে বিতর্কিত করতেই এই ভীতি ছড়ানোর সস্তা চেষ্টা চালানো হচ্ছে।জেরুজালেমের মঞ্চ থেকে মুসলিমবিদ্বেষী প্রোপাগান্ডাসম্প্রতি ইসরায়েলের জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত হয় ‘জেরুজালেম নিউজ সিন্ডিকেট (JNS)’ আয়োজিত দ্বিতীয় বার্ষিক আন্তর্জাতিক নীতি সম্মেলন। এই সম্মেলনে প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নিয়ে চরম উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন কট্টর ইহুদিবাদী সংগঠন ‘হেরুত ইসরায়েল ফ্রিডম সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আমিয়াদ কোহেন। ওই অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও উপস্থিত ছিলেন।সম্মেলনে কোহেন দাবি করেন, "বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক নম্বর হুমকি হলো মুসলিম ব্রাদারহুড। কেয়ার (CAIR) এবং মুসলিম ব্রাদারহুড এখন ফ্লোরিডা ও টেক্সাস অঙ্গরাজ্য দখল করার চেষ্টা করছে। প্রথমে তারা ফ্লোরিডা নেবে, তারপর টেক্সাস, আর এভাবেই পুরো আমেরিকার পতন ঘটবে। নিউ ইয়র্ক তো তারা ইতিমধ্যেই দখল করে নিয়েছে।"কোহেন এই পরিস্থিতিকে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, ইসরায়েলের জন্যও বড় হুমকি হিসেবে দেখান। তিনি আরও দাবি করেন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত মুসলিম ব্রাদারহুড মিশরকেও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে। শিয়া জিহাদি আন্দোলন দুর্বল হওয়ার পর সুন্নি আন্দোলন বিশ্বের জন্য হুমকি হবে দাবি করে তিনি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের আলেপ্পো, দামেস্ক ও জেরুজালেম সংক্রান্ত কিছু বক্তব্যের সূত্র ধরে বলেন, "পরবর্তী শত্রু হলো সুন্নি জিহাদি আন্দোলন। দুর্ভাগ্যবশত আমেরিকা এখন দুর্বল, তাই ইসরায়েল ও আমেরিকাকে আরও শক্তিশালী হতে হবে।"দাঁতভাঙা জবাব দিল ‘কেয়ার’ইহুদিবাদী লবির এই চরম মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আনাদোলু এজেন্সির (AA) কাছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কেয়ার-এর নিউ জার্সি চ্যাপ্টারের পরিচালক সালাহউদ্দিন মাকসুদ। কোহেনের সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন:"কোহেন এই সাক্ষাৎকারে যা বলেছেন তার একটি শব্দও সত্য নয়। সত্যি বলতে, এগুলো সাধারণ আমেরিকানদের মনে মুসলিমদের প্রতি আতঙ্ক ও ঘৃণা ছড়ানোর জন্য তৈরি করা সুপরিকল্পিত মিথ্যাচার।"সালাহউদ্দিন মাকসুদ স্পষ্ট করে বলেন, এই ভীতি ছড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও রাজনৈতিক জীবনে মুসলিমদের অংশগ্রহণকে অবৈধ ও অপবিত্র হিসেবে প্রমাণ করা। তবে এর পেছনে মূল কারণ অন্য জায়গায়। ইসরায়েলি লবি এখন গভীরভাবে আতঙ্কিত, কারণ সাধারণ আমেরিকানরা খুব দ্রুত ইসরায়েলের ওপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।দিশেহারা ইসরায়েলি লবি ও ‘আইপ্যাক’কেয়ার কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন মাকসুদ আরও বিশ্লেষণ করে জানান, মার্কিন জনগণ এখন ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ বা ‘আমেরিকার চেয়ে ইসরায়েল আগে’—এমন অন্ধ ও দাসত্বমূলক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করছে। আমেরিকার মূলধারার সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের ওপর ইহুদিবাদী লবি ‘আইপ্যাক’ (AIPAC)-এর যে অনৈতিক প্রভাব ছিল, তার বিরুদ্ধে মার্কিন সাধারণ জনগণ এখন সোচ্চার। আর এই বিষয়টিই ইহুদিবাদী ও গণহত্যা সমর্থনকারীদের সবচেয়ে বেশি ভীত করে তুলেছে।মাকসুদ বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণই হচ্ছে ইসরায়েল ও গণহত্যা-পন্থী লবির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। আর এই কারণেই তারা কেয়ার বা মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো সংস্থাকে কেন্দ্র করে এমন অবাস্তব ও ভিত্তিহীন গল্প ছড়াচ্ছে।"তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ঢেউয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, বর্তমানে ফিলিস্তিনপন্থী এবং মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করা মুসলিম ও অমুসলিম রাজনীতিকরা স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়—সবখানেই অভাবনীয় সাফল্য পাচ্ছেন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করছেন। এই গণতান্ত্রিক ও মানবিক উত্থানই আমিয়াদ কোহেনদের বর্ণবাদী ও যুদ্ধবাজ রাজনৈতিক দর্শনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে, যার কারণে তারা এখন মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে।