শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

ইসরাইল সমর্থিত লবিকে হারিয়ে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীর অভূতপূর্ব জয়

আমেরিকার জাতীয় রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির দলীয় মনোনয়ন বা প্রাইমারিতে জয়লাভ করেছেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম চিকিৎসক ও ডেমোক্র্যাট নেতা ড. আব্দুল এল-সায়েদ। গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট ২০২৬) অনুাষ্ঠিত মিশিগান অঙ্গরাজ্যের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে তিনি ইসরাইলপন্থী লবিগুলোর কোটি কোটি ডলারের প্রচারণাকে ব্যর্থ করে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হেলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন। গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা, ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার রক্ষা এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার এই প্রার্থী এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।বিপুল অর্থের প্রভাব পেছনে ফেলে সাধারণ মানুষের বিজয়মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল এই প্রাইমারি নির্বাচনে কোটি কোটি ডলারের করপোরেট ও লবিস্ট অর্থের বিপরীতে সাধারণ মানুষের তৃণমূল সমর্থনের ঐতিহাসিক জয় প্রত্যক্ষ করলো বিশ্ব। মার্কিন ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (AIPAC) অনুগত সুপার প্যাক ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ (UDP) সহ বহিরাগত ইসরাইলপন্থী গ্রুপগুলো প্রগতিশীল ও গাজাবান্ধব কণ্ঠস্বর ড. আব্দুল এল-সায়েদকে পরাজিত করতে ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল ফান্ড বিনিয়োগ করেছিল। একা AIPAC-ই এল-সায়েদের বিরুদ্ধে এবং তার বিরোধী মূলধারার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হেলি স্টিভেন্সের পক্ষে প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ডলারের বিজ্ঞাপন ছড়ায়।কিন্তু ড. এল-সায়েদ কোনো করপোরেট প্যাক (PAC) থেকে অর্থ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সাধারণ ভোটার ও তৃণমূল সমর্থকদের কাছ থেকে সংগৃহীত মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড নিয়ে লড়াই চালান। তার প্রচারণার মূল বার্তাই ছিল, "যদি নির্বাচনে জিততে আপনার ৬০-৭০ মিলিয়ন ডলারের লবিস্ট ফান্ডের দরকার হয়, তবে আপনি জনগণের সেবা নয়, বরং ওই দাতাদের শর্তেই চালিত হবেন।" ফলাফল গণনায় দেখা যায়, ৯৯% ভোট গণনা শেষে এল-সায়েদ ৪৮.৫% ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, যেখানে স্টিভেন্স পান ৪৭.৫% ভোট।গাজা ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইনির্বাচনী প্রচারণায় এল-সায়েদের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ ছিল গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানকে সরাসরি "গণহত্যা" হিসেবে চিহ্নিত করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরাইলকে দেয়া কোটি কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা অবিলম্বে বন্ধের জোর দাবি জানানো। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, আমেরিকান করদাতাদের অর্থ বিদেশে যুদ্ধ ও গণহত্যায় ব্যয় না করে দেশের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে ব্যবহার করতে হবে।তার এই অবস্থান তাকে ইসরাইলপন্থী মূলধারা ও কট্টর ডানপন্থীদের রোষানলে ফেলে। বিরোধীরা তাকে "র‍্যাডিক্যাল" বলে আখ্যা দেয় এবং প্রচারণায় সূক্ষ্ম ইসলামোফোবিক বক্তব্য ছড়িয়ে তাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। তা সত্ত্বেও মিশিগানের ডিয়ারবর্ন এলাকার বিশাল মুসলিম সম্প্রদায়, তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং যুদ্ধবিরোধী প্রগতিশীল ইহুদি সংগঠন ‘জুস ফর আব্দুল’ (Jews for Abdul)-এর সম্মিলিত সমর্থনে তিনি এ জয় ছিনিয়ে আনেন।ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরের মতাদর্শিক বিভাজনমিশিগানের এই ফলাফল ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। স্টিভেন্সের পেছনে ছিলেন পার্টি লিডার চ্যাঙ্ক শুমার ও মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারের মতো মূলধারার ডেমোক্র্যাট এস্টাবলিশমেন্ট। অন্যদিকে, ড. এল-সায়েদের পাশে দাঁড়ান স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, কংগ্রেসউম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্টেজ (AOC) এবং ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্স (UAW) ইউনিয়ন। সবার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা (Medicare for All) এবং রাজনীতি থেকে করপোরেট টাকার প্রভাব দূর করার প্রতিশ্রুতি তাকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।সিনেটের প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার পথেসিনেটর গ্যারি পিটার্সের অবসর গ্রহণের পর খালি হওয়া মিশিগানের এই আসনটিতে আগামী নভেম্বর ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে ড. এল-সায়েদ লড়বেন রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে। এই চূড়ান্ত নির্বাচনে বিজয়ী হলে ৩৯ বছর বয়সী ডেট্রয়েটের সাবেক এই স্বাস্থ্য পরিচালক মার্কিন ইতিহাস সৃষ্টি করে মার্কিন সিনেটের সর্বকালের প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

ইসরাইল সমর্থিত লবিকে হারিয়ে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীর অভূতপূর্ব জয়