সুপ্রিম কোর্ট 'সুপ্রিম' থাকার যোগ্য নয়: বাবরি-তিন তালাক রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় প্রশ্ন
জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের প্রধান মাওলানা মাহমুদ মাদানী সুপ্রিম কোর্টের বাবরি মসজিদ, তিন তালাক সহ একাধিক বিতর্কিত রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মধ্যপ্রদেশের ভোপালে জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, দেশের বিচার ব্যবস্থা গত কয়েক বছর ধরে সরকারের চাপে কাজ করছে। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে ব্যবস্থাগত বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার। মাদানীর এই বিস্ফোরক মন্তব্য ভারতের বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু সমাজের অবস্থান নিয়ে এক গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের প্রধান মাওলানা মাহমুদ মাদানী শনিবার ভোপালে সংগঠনের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট তখনই 'সুপ্রিম' নামে অভিহিত হওয়ার যোগ্য, যখন এটি সংবিধানকে অনুসরণ করে এবং আইনকে সমুন্নত রাখে। যদি তা না করে, তবে এর 'সুপ্রিম' নামে অভিহিত হওয়ার কোনো অধিকার নেই।মাদানী তাঁর মন্তব্যের সপক্ষে বাবরি মসজিদ এবং তাৎক্ষণিক তিন তালাক সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া বিতর্কিত রায়গুলিকে উল্লেখ করে দাবি করেন, এই রায়গুলি পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেয় যে দেশের বিচার বিভাগ বর্তমানে সরকারের প্রভাব ও চাপের মধ্যে কাজ করছে, যা বিচার ব্যবস্থার অখণ্ডতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতামাওলানা মাদানী দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও লক্ষ্যবস্তু হওয়ার বিষয়টি কঠোর ভাষায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মুসলিমদের তাদের ধর্মীয় পোশাক, পরিচিতি এবং জীবনযাত্রার কারণে সারা দেশে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।মাদানী অভিযোগ করেন, দেশের সমান নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমরা বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি বলেন, সরকার এবং প্রশাসন দ্বারা পরিচালিত 'বুলডোজার অ্যাকশন', 'গণপিটুনি' (মব লিঞ্চিং), 'অর্থনৈতিক বয়কট' এবং 'ঘৃণা প্রচারণ'-এর মতো ঘটনার মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করা হচ্ছে।ধর্মান্তর বিরোধী আইন ও 'জিহাদ'-এর অপব্যাখ্যাআদালতের রায়ের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন রাজ্যে প্রণীত ধর্মান্তর বিরোধী আইনগুলির তীব্র সমালোচনা করেন। মাদানী অভিযোগ করেন, এই আইনগুলি সংবিধান প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে। তিনি বলেন, এই আইনগুলিকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে ধর্ম পালন করাও ভয় ও শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যেখানে 'ঘর ওয়াপসি'-এর নামে যারা ধর্মান্তর করাচ্ছে, তারা সম্পূর্ণ আইনি ছাড় পাচ্ছে।জমিয়ত প্রধান আরও দাবি করেন যে, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর প্রচেষ্টা বেড়ে চলেছে। তাঁর মতে, 'জিহাদ'-এর পবিত্র ইসলামিক ধারণাকে 'পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা হচ্ছে' এবং এটিকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে। তিনি 'লাভ জিহাদ', 'ল্যান্ড জিহাদ' এবং 'স্পিট জিহাদ'-এর মতো শব্দবন্ধগুলিকে মুসলিমদের বদনাম করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি স্পষ্ট করেন, ইসলামে জিহাদ মানে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।বিজেপি-র তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা অভিযোগমাদানির এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিজেপি সাংসদ ও জাতীয় মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কখনো ধর্মের ভিত্তিতে কোনো রায় দেয় না। তিনি মাদানীর এই মন্তব্যের জন্য সর্বোচ্চ আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা নেওয়ার দাবি জানান।এর আগে জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের অন্য এক গোষ্ঠীর প্রধান মাওলানা আরশাদ মাদানীর মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। আরশাদ মাদানী দাবি করেছিলেন, একজন মুসলিম নিউ ইয়র্কের মেয়র হতে পারলেও ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে পারে না।মধ্যপ্রদেশের মন্ত্রী বিশ্বাস সারং এবং বিজেপি বিধায়ক রামেশ্বর শর্মাও মাদানীর মন্তব্যকে 'সাংবিধানিক ব্যবস্থার অপমান' বলে অভিহিত করেছেন। শর্মা উল্টে মাওলানা মাদানীকে পরামর্শ দেন, ইসলামকে বদনাম থেকে বাঁচাতে তিনি যেন তাঁর সন্তানদের 'লাভ জিহাদ' এবং 'ল্যান্ড জিহাদ'-এর মতো কাজ থেকে দূরে থাকতে শেখান, যা প্রকারান্তরে মুসলিমদের বৈষম্যের অভিযোগকে আরও উসকে দিয়েছে।