বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

ফিলিস্তিনপন্থীদের তথ্য জোগাড় করতে ক্যাফে মালিককে ‘গোয়েন্দা’ হওয়ার প্রস্তাব পুলিশের

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার শহরে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারীদের ওপর নজরদারি এবং তথ্য ফাঁসের জন্য এক ক্যাফে মালিককে প্রস্তাব দিয়েছে ব্রিটিশ পুলিশ। ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ (Palestine Action) নামক অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীর কর্মীদের গুপ্তচরবৃত্তি বা তথ্য সংগ্রহের বিনিময়ে ওই ব্যক্তিকে বিপুল আর্থিক সুবিধা এবং তার ছোটখাটো অপরাধকে হালকাভাবে দেখার প্রলোভন দেখানো হয়। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার এলাকার একজন ক্যাফে ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন যে, ফিলিস্তিনপন্থী গোষ্ঠী ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর কর্মীদের ‘ফিঞ্চলে’ বা চিহ্নিত করতে গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ (GMP) তাকে তথ্যদাতা (ইনফর্মার) হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।নিরাপত্তার স্বার্থে ছদ্মনাম ব্যবহার করা ৫১ বছর বয়সী শামস সাদিক নামের ওই ব্যক্তি ম্যানচেস্টারে দুটি ক্যাফে পরিচালনা করেন। তিনি জানান, গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের দুজন কর্মকর্তা সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এই প্রস্তাব দেন।ঘটনার সূত্রপাত ও পুলিশের প্রস্তাবশামস সাদিক জানান, গত বছর একটি বিক্ষোভের ঘটনার সূত্র ধরে তাকে আটক করা হয়েছিল এবং তার ব্যক্তিগত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা ফোন-ল্যাপটপ পুলিশ জব্দ করে। গত ১৫ মে তিনি যখন সেসব ডিভাইস ফেরত নিতে থানায় যান, তখন পুলিশের পক্ষ থেকে এই অনৈতিক প্রস্তাব আসে।সাদিক বলেন, "পুলিশ কর্মকর্তারা ডিভাইসগুলো পরীক্ষার পর আমাকে বলেন যে আমি ফিলিস্তিনপন্থী ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জড়িত, তা তারা জানেন। কিন্তু তারা আমার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা বা অভিযোগ গঠন করবেন না। উল্টো তারা বলেন, 'আমাদের তথ্য দিয়ে সাহায্য করার অনেক সুবিধা আছে।' আমি কী ধরনের সুবিধা জানতে চাইলে তারা জানান, এর বিনিময়ে আমাকে বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে।"তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে আশ্বাস দেন যে বড় কোনো গুরুতর অপরাধ না হলে তার করা সাধারণ আইন লঙ্ঘন বা ছোটখাটো অপরাধগুলোকেও পুলিশ চোখ বুজে এড়িয়ে যাবে।বিমানবন্দর ও মসজিদে নজরদারির চাপপুলিশের এই অনৈতিক প্রস্তাব সাদিক সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আরও জানান, এই ঘটনার ঠিক চার দিন আগে মরক্কো সফর শেষে ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরে নামলে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের (Terrorism Act) আওতায় কোনো নোটিশ ছাড়াই দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তার ধারণা, স্থানীয় মসজিদে কারা কট্টরপন্থী চিন্তাভাবনা লালন করছে, তাদের চিহ্নিত করতেও পুলিশ তাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলে অংশ নেওয়া এবং প্রচারপত্র বিলি করার কারণে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, "এখন নিজেকে অন্য কারও চেয়ে পুলিশের কাছ থেকেই বেশি সুরক্ষিত রাখতে হবে বলে মনে হচ্ছে।"আইনজীবীর বক্তব্য ও পুলিশের অবস্থানএদিকে এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ (GMP) একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিলেও তারা নির্দিষ্ট এই ঘটনা বা অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।নাগরিক অধিকার ও আইনি কাঠামোর দিক থেকে এই ঘটনাটি গুরুতর প্রশ্ন উস্কে দিয়েছে। শামস সাদিকের আইনজীবী সাইমন পুক এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।"রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন সাধারণ নাগরিককে এভাবে অন্য একটি রাজনৈতিক অধিকার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করার জন্য প্রলোভন দেখানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিমানবন্দরের সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ক্ষমতাকে এখানে ভিন্ন উদ্দেশ্যে এবং সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।"যুক্তরাজ্যে যেকোনো শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক ও মানবিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এই ঘটনাটি ইঙ্গিত করে যে, ফিলিস্তিনপন্থী সাধারণ আন্দোলনকারীদের ওপরও রাষ্ট্রীয় নজরদারি বাড়ানোর একটি অঘোষিত চেষ্টা চলছে, যা নাগরিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো নির্দিষ্ট মানবিক বা রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে নাগরিকদের এভাবে পুলিশি হয়রানি বা প্রলোভনের মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের নীরবতা এই অভিযোগের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা আগামী দিনে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে আরও প্রভাবিত করতে পারে।

ফিলিস্তিনপন্থীদের তথ্য জোগাড় করতে ক্যাফে মালিককে ‘গোয়েন্দা’ হওয়ার প্রস্তাব পুলিশের