মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

অটোমান আমলে কেন ইস্তাম্বুলে সাধারণ মানুষের ঘোড়ায় চড়া নিষিদ্ধ ছিল?

বর্তমান যুগের বিলাসবহুল সরকারি গাড়ি বা প্রটোকলের মতোই অটোমান (উসমানীয়) সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে ঘোড়াকে দেখা হতো এক অনন্য সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে। তৎকালীন ইস্তাম্বুলের সংকীর্ণ রাস্তাঘাটে বিশৃঙ্খলা রোধ, শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের জন্য ঘোড়ায় চড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। ঐতিহাসিক বিভিন্ন ফরমান থেকে জানা যায়, এই নিয়মগুলো সমাজের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।প্রাচীন ইস্তাম্বুলের বুকে যেকোনো সাধারণ নাগরিক চাইলেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াতে পারতেন না। আজকের আধুনিক মহানগরীগুলোতে যেভাবে ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা হয়, ঠিক তেমনি পুরনো ইস্তাম্বুলের সরু গলিগুলোতেও চতুষ্পদ বাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছিল কঠোর শ্রেণিবিন্যাস। সে যুগে দৈনিক যাতায়াতের জন্য ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো কেবল সুলতান এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত একটি বিশেষ অধিকার বা প্রিভিলেজ ছিল। শক্তি, আভিজাত্য এবং সামরিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই মহিমান্বিত প্রাণীকে সাধারণ মানুষ নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যক্তিগত বাহন হিসেবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ ছিল না।অর্থ থাকলেও মিলত না ঘোড়ায় চড়ার অনুমতিতানজিমাত (অটোমান সংস্কার যুগ) পূর্ববর্তী ইস্তাম্বুলে সামাজিক শ্রেণির মধ্যকার বিভাজন রেখা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। সমাজের উৎপাদনশীল ও করদাতা সাধারণ জনগোষ্ঠী, যাদের 'রোয়া' (Reaya) বলা হতো, তারা যত বড় ধনী ব্যবসায়ীই হোন না কেন—কেবল অর্থ বা প্রতিপত্তি থাকার জোরেই শহরের ভেতর ঘোড়া ব্যবহার করতে পারতেন না। দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য তাদের সাধারণত হেঁটেই চলতে হতো অথবা তারা ঘোড়ার গাড়ি (রথ বা ছকড়া গাড়ি) ব্যবহার করতে পারতেন। এই কঠোর নিয়ম অমান্য করে কোনো সাধারণ নাগরিক শহরের ভেতর ঘোড়ায় চড়লে তাকে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও প্রোটোকল ভঙ্গের দায়ে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো।অমুসলিম প্রজাদের জন্য খচ্চর ও গাধা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাঅটোমান আইন ব্যবস্থায় সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার মূল দর্শন প্রতিফলিত হতো যাতায়াতের বাহন নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। ইসলামী আইন এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের নিয়ম অনুযায়ী, অমুসলিম প্রজারা যাতে বাহ্যিক বা শারীরিক দিক থেকে মুসলিমদের চেয়ে 'উঁচুতে' অবস্থান না করেন, তা নিশ্চিত করতে তাদের ঘোড়ার কাছাকাছিও ঘেঁষতে দেওয়া হতো না। শহরের অভ্যন্তরে যাতায়াতের জন্য তারা কেবল খচ্চর কিংবা গাধা ব্যবহার করতে পারতেন। তবে এই নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন বিদেশি রাষ্ট্রদূত এবং রাষ্ট্র থেকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বা ফরমানপ্রাপ্ত সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতারা।সংকীর্ণ সড়ক ও নিরাপত্তার কারণঘোড়া ব্যবহারের ওপর আরোপিত এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার পেছনে কেবল সামাজিক বা শ্রেণিগত বৈষম্যই ছিল না; এর পেছনে ছিল কিছু বাস্তবসম্মত ও জননিরাপত্তামূলক কারণ। প্রাচীন ইস্তাম্বুলের কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি পরিবেষ্টিত ঘনবসতিপূর্ণ এবং অত্যন্ত সরু সড়কগুলোতে যেখানে সাধারণ পথচারীদের ব্যাপক আনাগোনা ছিল, সেখানে সবার জন্য ঘোড়া ছোটানোর অনুমতি দিলে তা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করত। অটোমান আমলের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নথি 'মুহিম্মে দেফতের্লারি' (Mühimme Defterleri) এবং তৎকালীন বিভিন্ন রাজকীয় ফরমানে বর্ণিত এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত শহরের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলাকে একদম ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রেখেছিল।

অটোমান আমলে কেন ইস্তাম্বুলে সাধারণ মানুষের ঘোড়ায় চড়া নিষিদ্ধ ছিল?