ইউরোপের দেশ সুইডেনের উপসালা শহরে একটি মসজিদে ন্যাক্কারজনক বর্ণবাদী হামলার ঘটনা ঘটেছে। পবিত্র রমজান পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজ যখন স্বাভাবিক ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত, তখন মধ্যরাতে মসজিদের দেয়ালে নাৎসি প্রতীক ও বিদ্বেষমূলক বার্তা ছড়িয়ে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ ও মুসলিম সমাজ এই ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।সুইডেনের স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত মধ্যরাতে উপসালা মসজিদের দেয়ালে গবাদি পশুর রক্ত দিয়ে 'স্বস্তিকা' বা নাৎসি প্রতীক আঁকার খবর পাওয়া যায়। পুলিশের টহল দল দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ঘটনাস্থলের কাছ থেকেই বাইসাইকেল আরোহী এক নারীকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে।পুলিশি তল্লাশিতে ওই নারীর কাছে একটি ধারালো ছুরি এবং দেয়ালে লেখার কাজে ব্যবহৃত এক বক্স গরুর রক্ত উদ্ধার করা হয়। পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তার বিরুদ্ধে ‘সম্পত্তির মারাত্মক ক্ষতি’, ‘ঘৃণা পোষণ বা উস্কানি’ এবং ‘অস্ত্র আইন লঙ্ঘন’-এর অভিযোগে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।" পুলিশ আরও জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তির পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় তাকে আপাতত কারারুদ্ধ করা হয়নি।ঘটনাটি ঘটেছে ৫ এপ্রিল সুইডেনের চতুর্থ বৃহত্তম শহর উপসালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত নারী রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করতে এই ঘৃণ্য পথ বেছে নেন।উপসালা মসজিদ পরিচালনা কমিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, "দেয়ালের এই নাৎসি চিহ্ন এবং মুসলিমদের প্রতি প্রকাশ্য হুমকি কেবল আমাদের মসজিদের ওপর হামলা নয়; বরং এটি সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপরও বড় আঘাত।" এই ঘটনার পর স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য যে, এই একই মসজিদে ২০১৫ সালেও ভয়াবহ 'মলোটভ ককটেল' (বোমা) হামলা চালানো হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে অঞ্চলটিতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে এই ধর্মীয় উপাসনালয়টি।ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব। সুইডিশ সংবিধানেও নাগরিক নিরাপত্তা ও ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। বারবার একই মসজিদে হামলা হওয়া সত্ত্বেও সন্দেহভাজনকে দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় মুসলিম সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মনে প্রশ্ন তুলেছে।জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এবং ওআইসি (OIC) বারবার উল্লেখ করেছে যে, ক্রমবর্ধমান 'ইসলামোফোবিয়া' বা ইসলামবিদ্বেষ প্রতিরোধে দেশগুলোকে কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং কার্যকর তদারকি বাড়াতে হবে। উপসালা মসজিদের এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি কাঠামোগত অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই ঘটনার একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে করে ভবিষ্যতে কোনো উপাসনালয় এমন ঘৃণ্য হামলার শিকার না হয়।