জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পুনর্গঠন এবং স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর 'ভেটো ক্ষমতা' সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নেতাদের সামনে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিচালিত গণহত্যাকে আবারও স্পষ্টভাবে ধিক্কার জানান এবং অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। সানচেজ সতর্ক করে বলেন, বিশ্বব্যবস্থার মূলভিত্তি ধ্বংস করতে কিছু কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার চক্রান্ত চালাচ্ছে।জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা রহিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে আয়োজিত সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক কাঠামোর এই আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব পেশ করেন।সানচেজ বলেন, “আমাদের নিরাপত্তা পরিষদকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যাতে বিশ্বের সব অঞ্চল সেখানে সমান ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব পায়। এর পাশাপাশি স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রয়োগের অধিকার চিরতরে বন্ধ করতে হবে।” জাতিসংঘ সনদের মূলনীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “কোনো দেশ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, নিজের অপরাধের বিচারে সে নিজেই বিচারক হতে পারে না।”বহুপাক্ষিকতার ওপর পরিকল্পিত হামলা ও অন্ধকারের শঙ্কাস্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি—শান্তি, টেকসই উন্নয়ন ও সমান সুযোগ—রাজনৈতিক শক্তি ও কিছু সরকারের দ্বারা ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য বিশ্বকে এক 'অন্ধকার অতীতে' ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। সানচেজ বলেন, “আমার আলাদা করে তাদের নাম বলার প্রয়োজন নেই; তারা কারা এবং তাদের কাজের পদ্ধতি কী, তা আমরা সবাই ভালো করেই জানি।”তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে ধ্বংস করতে একটি পরিকল্পিত ও সমন্বয়ভিত্তিক চক্রান্ত চলছে। এসব উগ্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রথমে আন্তর্জাতিক আইন প্রশ্নবিদ্ধ করে, এরপর তা ভঙ্গ করে, বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোতে আর্থিক অনুদান বন্ধ করে দেয় এবং সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। শেষপর্যন্ত এ সংস্থাগুলোকে 'অকার্যকর' তকমা দিয়ে তা বর্জনের আহ্বান জানায়।গাজা গণহত্যা ও স্পেনের দৃঢ় অবস্থানআন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে স্পেনের ভূখণ্ড ও পররাষ্ট্রনীতির পদক্ষেপ তুলে ধরে সানচেজ জানান, জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী যেকোনো কাজের বিরুদ্ধে মাদ্রিদ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি স্পেন ইসরায়েল সরকারের ওপর সম্পূর্ণ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।একইসঙ্গে তিনি গাজায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কর্তৃক অব্যাহতভাবে পরিচালিত “গণহত্যার” কঠোর ও অকাট্য নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করেন।বিশ্বনেতৃত্বে নারী ও শরণার্থী সংকটজাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সানচেজ প্রস্তাব করেন, জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হওয়া উচিত লাতিন আমেরিকার একজন নারী। তিনি মনে করিয়ে দেন, জাতিসংঘের ইতিহাসে এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা ৯ জন মহাসচিবের সকলেই ছিলেন পুরুষ; তাই লাতিন আমেরিকার কোনো নারীকে দায়িত্ব দেওয়া ঐতিহাসিক ঋণের সমতুল্য।ভাষণের শেষাংশে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) চলমান অনিয়মিত অভিবাসন সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, স্পেন কখনও অভিবাসীদের 'শত্রু' হিসেবে দাঁড় করাবে না বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে না। সরকারি তথ্যমতে, গত ৩০-৩১ জুলাই মরক্কো থেকে প্রায় ৭২,০০০ মানুষ সেউতায় প্রবেশ করে এবং বর্তমানে শিশুসহ তিন হাজারের বেশি অভিবাসী সেখানে রাস্তায় মানবিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। স্পেন সহজ পথ নয়, বরং ন্যায়ের পথ বেছে নিয়ে মানবাধিকার বজায় রেখে এই সংকট সমাধান করবে বলে সানচেজ প্রতিশ্রুতি দেন।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।