বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ: টিকা সংকটে শিশুদের প্রাণ কাড়ছে হাম, মৃত্যু ৮০০ ছোঁই ছোঁই
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—বিশ্বে বর্তমানে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন শিশু হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে, যা বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিগত বছরগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা, টিকার সংকট এবং টিকাদান কাভারেজ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় দেশে এই মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৮০০ শিশুর প্রাণহানি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এক চরম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।একসময়ের নিয়ন্ত্রণে আসা ও প্রায় 'ভুলতে বসা' ছোঁয়াচে রোগ 'হাম' বাংলাদেশে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক মহামারি ও অভ্যন্তরীণ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের শিশু স্বাস্থ্যে নেমে এসেছে বিপর্যয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি, যার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।বিশ্ব ও আঞ্চলিক চিত্রডব্লিউএইচওর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উল্লিখিত ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে।বাংলাদেশ: ৪২,১৭৪ জন (শীর্ষ স্থান)ভারত: ২৬,৬০৭ জন (দ্বিতীয় স্থান)ইয়েমেন: ১৪,৫২১ জন (তৃতীয় স্থান)পরবর্তী অবস্থানগুলোতে রয়েছে মেক্সিকো, পাকিস্তান, ক্যামেরুন, কাজাখস্তান, গুয়েতেমালা, অ্যাঙ্গোলা ও সুদান। যেখানে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালে এসে এটি মহামারি রূপ ধারণ করেছে।+-------------------------------------------------------------+| বিশ্বে হাম সংক্রমণের শীর্ষে থাকা দেশসমূহ |+-------------------------------------------------------------+| ১. বাংলাদেশ : ৪২,১৭৪ জন || ২. ভারত : ২৬,৬০৭ জন || ৩. ইয়েমেন : ১৪,৫২১ জন || ৪. মেক্সিকো : ১২,৪৯৫ জন || ৫. পাকিস্তান : ১১,০৩৭ জন |+-------------------------------------------------------------+শিশু মৃত্যু ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সন্দেহজনক ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন এবং নিশ্চিত ১৪,৭০৮ জন হামের রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হাম নিশ্চিত হয়ে ৯৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ৭০২ জন—সব মিলিয়ে ৭৯৭ জন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, "বাংলাদেশ কেবল সংক্রমণেই শীর্ষে নয়, হামে শিশু মৃত্যুর হারও সম্ভবত বিশ্বে এবার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ।"সংকটের মূল কারণ: টিকাদানে অবহেলা ও পলিসিগত ভুলএকসময় বাংলাদেশে নিয়মিত ও জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাদানের কাভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। কিন্তু সম্প্রতি এই সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়েছে:নীতিগত পরিবর্তন ও সতর্কবার্তা উপেক্ষা: ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে প্রচলিত টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে টিকা সরবরাহে বড় ধরনের জট ও ঘাটতি তৈরি হয়। ইউনিসেফ চিঠির মাধ্যমে প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক করলেও তাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।কাভারেজ কমে যাওয়া: ২০২০-২১ সালের পর হাম ও রুবেলার বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং নিয়মিত টিকাদানের হার ২০২৫ সালে কমে ৫৯%-এ নেমে আসায় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়।জরুরি ক্যাম্পেইনেও চরম ঘাটতি: সম্প্রতি নতুন বিএনপি সরকার শিশুদের রক্ষায় গণটিকা কর্মসূচি শুরু করলেও সঠিক গণনার অভাবে অন্তত ৪৬ লাখ শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে।আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান সতর্ক করে বলেন, "হার্ড ইমিউনিটি এক দিনে গড়ে ওঠে না, আবার এক দিনে ভেঙেও পড়ে না। টানা ঘাটতির ফলে শিশুদের সুরক্ষা বলয় ভেঙে গেছে, যার মাশুল দিচ্ছে এখন পুরো দেশ।"