বুধবার, ২০ মে ২০২৬
বুধবার, ২০ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

হায়দরাবাদ মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণের ১৯ বছর: আজো মেলেনি অপরাধীর সন্ধান, উপেক্ষিত ন্যায়বিচার

ভারতের হায়দরাবাদের ঐতিহাসিক মক্কা মসজিদে ভয়াবহ পাইপ বোমা বিস্ফোরণের ১৯ বছর পূর্ণ হলেও আজো অনুদঘাটিত রয়ে গেছে এই জঘন্য অপরাধের মূল কুশীলবদের পরিচয়। ২০০৭ সালের ওই হামলায় ৯ জন মুসলিম প্রাণ হারান এবং পরবর্তীতে পুলিশের গুলিতে আরও ৫ জন নিহত হন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর আজো ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মনে একই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— "আসল অপরাধী কে?" কারণ, ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র বিশেষ আদালত অপর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য বৈরিতার কারণে মামলার সমস্ত আসামিকে খালাস করে দেওয়ায় এই ট্র্যাজেডির কোনো কিনারা হয়নি।২০০৭ সালের ১৮ মে ছিল হায়দরাবাদের ইতিহাসের অন্যতম এক অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন। পবিত্র জুমার নামাজের সময় ঐতিহাসিক মক্কা মসজিদের ভেতরে একটি শক্তিশালী পাইপ বোমা বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে একটি পবিত্র উপাসনালয় রক্তগঙ্গা ও শোকের কান্নায় ভেঙে পড়ে। নিরীহ মুসল্লিরা শাহাদাতবরণ করেন এবং বহু মানুষ গুরুতরভাবে আহত হন। আল্লাহর পবিত্র ঘরের ভেতরে মুসলমানদের রক্ত ঝরেছিল, যার যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি আজো অসংখ্য পরিবারের হৃদয়ে অনুরণিত হয়।তবে এই ট্র্যাজেডির এখানেই শেষ ছিল না। বিস্ফোরণের পরপরই মসজিদের বাইরে জমায়েত হওয়া ক্ষুব্ধ জনতার ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। ফলে আরও পাঁচজন নিরীহ মুসলিম প্রাণ হারান এবং অনেকে আহত হন। যেখানে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে রাষ্ট্রীয় বর্বরতা এবং দমনপীড়নের এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়।বিস্ফোরণের পরপরই হায়দরাবাদ পুলিশ এবং রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন 'হারকাত-উল-জিহাদ-ই-ইসলামী'-কে সন্দেহ করে। কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই ১০০-রও বেশি মুসলিম যুবককে আটক করা হয়। এই প্রাথমিক তদন্তের নামে অসংখ্য যুবকের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন এবং তাদের অন্যায়ভাবে কারাবন্দী করে রাখা হয়। পরবর্তীতে রাজ্যের সংখ্যালঘু কমিশনের একটি সত্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এই নির্মম নির্যাতনের বিবরণ বিস্তারিতভাবে উঠে আসে। ২০০৯ সালে পর্যাপ্ত প্রমাণের চরম অভাব থাকায় প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করা ২১ জন যুবকের সবাইকেই আদালত খালাস দেন। ততদিনে গণমাধ্যমের একপেশে ট্রায়াল এবং দীর্ঘ কারাবাসে ওই যুবকদের জীবন চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়, ভেঙে পড়ে তাদের পরিবার।পরবর্তী বছরগুলোতে তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমগুলোর আলোচনায় 'হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের' সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নাম ও সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আসল অপরাধীরা কারা ছিল, সেই রহস্য উদঘাটিত হয়নি। কেন আজো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলো না এবং এই নিরীহ প্রাণহানির দায় কে নেবে— এই ব্যথাতুর প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর মেলেনি।দুর্ভাগ্যবশত, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতে এমন বহু ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে যেখানে প্রথমে নিরীহ মুসলমানদের গ্রেপ্তার করা হয়, জনসমক্ষে হেনস্তা ও অপমানিত করা হয় এবং বছরের পর বছর পর যখন তদন্তের দিক পরিবর্তন হয়, ততদিনে তাদের জীবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।এই দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়নের বিরুদ্ধে বর্তমান নেতৃত্ব, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী এবং বড় বড় সংগঠনগুলোর নীরবতা আজ বড় প্রশ্ন খাড়া করেছে। মুসলিম ইতিহাসের খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর যুগে একজন নারীর আর্তনাদ "ওয়া মুতাসিমাহ!" শুনে যেখানে পুরো সেনাবাহিনী ওড়ানো হয়েছিল, আজ হাজারো মজলুমের কান্নাও সমাজকে জাগ্রত করতে পারছে না।রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই ইমাম বা নেতা হলেন একটি ঢাল, যার পেছনে থেকে যুদ্ধ করা হয় এবং যার মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভ করা হয়।" ইসলামের ইতিহাসে খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর এক ইহুদির সাথে আদালতে মুখোমুখি হওয়া, সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর শত্রুদের প্রতি দয়া এবং খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তি— "ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা যায়, তবে উমরকে সেজন্য জবাবদিহি করতে হবে"—আজো বিশ্বমানবতার জন্য ন্যায়বিচারের শাশ্বত দৃষ্টান্ত।পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাকো এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।" একইভাবে সূরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও ইহসানের নির্দেশ দিয়েছেন।রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ধ্বংসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন যে, তারা প্রভাবশালী ব্যক্তি চুরি করলে ছেড়ে দিত এবং দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে শাস্তি দিত। ইসলামে ন্যায়বিচার কেবল মুসলমানদের জন্য সুনির্দিষ্ট নয়, এটি পুরো মানবজাতির অধিকার। বর্তমানের এই ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থায় যখন ঐশী নির্দেশনা উপেক্ষিত, তখন সমাজজুড়ে জুলুমের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। আজ সমগ্র মজলুম মানবতার স্বার্থে এমন একটি ব্যবস্থার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন যা প্রকৃত ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও নৈতিক নেতৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। মহান আল্লাহ মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণের শহীদদের রহমত দান করুন, নির্দোষদের ন্যায়বিচার দিন এবং প্রকৃত অপরাধীদের দুনিয়া ও আখিরাতে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করুন।

হায়দরাবাদ মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণের ১৯ বছর: আজো মেলেনি অপরাধীর সন্ধান, উপেক্ষিত ন্যায়বিচার