ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করে বিরোধী দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা ও মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিং বলেছেন, বিজেপির মূল মতাদর্শ কোনো ধর্মভিত্তিক দর্শন নয়, বরং এটি একটি বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী চরমপন্থী ভাবধারা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভারতের মধ্যপ্রদেশের গুনা জেলায় তাঁর ৯৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘সত্য সনাতন স্বাভিমান যাত্রা’র চলাকালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, হিন্দুত্ববাদ কোনো সাধারণ ধর্মীয় চেতনা নয়; আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এই উগ্র মতাদর্শ ছড়িয়ে সমাজে হিংসা ও বিভাজন তৈরি করছে।ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের উগ্রবাদী অবস্থানের বিরুদ্ধে নতুন করে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দিগ্বিজয় সিং দাবি করেছেন, বিজেপির তথাকথিত ‘হিন্দুত্ব’ চেতনা প্রকৃতপক্ষে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টকারী এক ধরনের উগ্র উগ্র রাজনৈতিক হাতিয়ার।মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী থেকে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা পর্যন্ত ৯৩০ কিলোমিটার বিস্তৃত ‘সত্য সনাতন স্বাভিমান যাত্রা’ চলাকালে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দিগ্বিজয় সিং স্পষ্ট করে বলেন, "আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই। আসল ধর্মীয় চেতনা সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং গোটা বিশ্বের কল্যাণে কাজ করে। কিন্তু আরএসএস (RSS) এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) যে ভাবধারা অনুসরণ করে, তা হলো উগ্র হিন্দুত্ববাদ—যা কেবল ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায়। হিন্দুত্ববাদের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন বিডি সাভারকর নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, এই রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের সাথে আত্মিক বা নৈতিক ধর্মের কোনো প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ নেই।"তিনি আরও অভিযোগ করেন, তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে সনাতন ধর্মের মূল শিক্ষা নিয়ে কথা বলা শুরু করার পরই বিজেপি কৌশলগতভাবে এই পরিভাষাটি ব্যবহার করা শুরু করেছে। কিন্তু বাস্তবে বিজেপির আসল চালিকাশক্তি হলো হিন্দুত্বভিত্তিক চরমপন্থা, কোনো মানবিক ধর্মীয় শিক্ষা নয়।একই সুর মিলিয়ে কংগ্রেসের অপর জ্যেষ্ঠ নেতা উদিত রাজ বিজেপি ও আরএসএসের ঐতিহাসিক ভূমিকার চরম সমালোচনা করেন। তিনি ভিনায়ক দামোদর সাভারকরের বর্ণবাদী নীতির উল্লেখ করে বলেন, সাভারকরের সংজ্ঞায়িত ‘পুণ্যভূমি’ ও ‘জন্মভূমি’ তত্ত্ব ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করেছে। এই মতাদর্শের মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে—ভারতে বসবাসকারী মুসলিম ও খ্রিস্টানদের জন্মভূমি এ দেশ হলেও তাঁদের ‘পুণ্যভূমি’ অন্য কোথাও। এটি সরাসরি সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার এবং সামাজিক ঐক্য বিনষ্ট করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত।উদিত রাজ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অমুসলিম ও সংখ্যালঘুদের আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরে বলেন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রায় ৬১,০০০ মুসলিম এবং প্রায় ৮,০০০০০ শিখ ধর্মাবলম্বী নাগরিক নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। বিপরীতে, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বা আত্মত্যাগের ইতিহাস নেই।তিনি উগ্র হিন্দুত্ববাদকে একটি চরম বিভাজনকারী রাজনৈতিক তত্ত্ব আখ্যা দিয়ে বিজেপি ও আরএসএসকে ভারতের প্রকৃত ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অবদান নিয়ে খোলাখুলি বিতর্কের চ্যালেঞ্জ জানান।বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে মোদি সরকারের আমলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর অব্যাহত দমন-পীড়ন, বুলডোজার সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নিপীড়নের মধ্যে ভারতীয় রাজনীতিতে এই বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভারতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদের চরম ব্যবহার কীভাবে সংখ্যালঘুদের মৌলিক মানবাধিকার হুমকির মুখে ফেলছে, বিরোধী নেতাদের বক্তব্যে তা আবারও স্পষ্ট হলো।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।