রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

জনসমক্ষে 'আমেরিকার ধ্বংস' জপলেও পেছনে ওয়াশিংটনের কাছে অনুনয় হুতিদের

ইয়ামানের হুতি বিদ্রোহীরা বছরের পর বছর ধরে ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ স্লোগানকে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রচারণার মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক এক উন্মোচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিরা গোপনে তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরাসরি মার্কিন সামরিক সংঘাত এড়ানোর আকুতি জানিয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালীর কৌশলগত এলাকায় হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার মুখে এই তথ্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তাদের দ্বিমুখী কৌশলের বড় ধরনের প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে।ইয়ামানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাহ্যিক দৃশ্যটি বহু বছর ধরেই পরিচিত। হুতিদের ব্যানার উড়ছে, সশস্ত্র মিছিল চলছে এবং বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া তাদের মূল স্লোগান—"আমেরিকা ধ্বংস হোক, ইসরাইল ধ্বংস হোক"—মিছিল ও সমাবেশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু রাজনীতি ও যুদ্ধের ময়দানে সাধারণ মানুষের সামনে যে দৃশ্য তুলে ধরা হয়, পর্দার আড়ালের বাস্তবতা সবসময় এক থাকে না।ইয়ামান যুদ্ধের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে সাবেক ও হবু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মাত্র বক্তব্য সেই আড়ালের দৃশ্যপট উন্মোচন করেছে। আয়ারল্যান্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানান, হুতিরা তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করুক।এই তথ্যটি হুতিদের কোনো আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ, সৌদি কর্মকর্তা বা গোপন সূত্রের মাধ্যমে আসেনি; বরং সরাসরি ট্রাম্প এটি সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করেছেন। এতে একটি গভীর বৈপরীত্য সামনে এসেছে: যে গোষ্ঠীটি নিজেদের অস্তিত্ব ও আদর্শের মূল ভিত্তি বানিয়েছে "আমেরিকা ধ্বংস হোক" স্লোগানকে, তারা কেন যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি সংঘাত এড়াতে ব্যাকুল?সমাবেশের স্লোগান বনাম আড়ালের হিসাবহুতিদের রাজনৈতিক সংলাপে তাদের এই তথাকথিত 'যুদ্ধের ডাক' কেবল সাধারণ প্রচারণামূলক বাক্য নয়, এটি তাদের অনুসারীদের একত্রিত করার প্রধান হাতিয়ার। তবে হুতিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের জনসমক্ষে প্রদত্ত বক্তব্য এবং রাজকীয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে ব্যবধান নতুন কিছু নয়।২০১৬ সালে কুয়েত শান্তি আলোচনার সময়ও হুতি প্রতিনিধিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের কাছে এই স্লোগান ব্যবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিল। তখন তারা জানিয়েছিল, এই স্লোগানটি মূলত অভ্যন্তরীণ সমর্থক গোষ্ঠী ও সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ২০১৬ সালের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। হুতিরা এখন কেবল অভ্যন্তরীণ যোদ্ধা গোষ্ঠী নয়; তারা সম্প্রতি পশ্চিম উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে লোহিত সাগরের কৌশলগত দ্বীপ মাইয়ুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদাব প্রণালীর কাছাকাছি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এই লোহিত সাগরে তাদের অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।একদিকে যখন জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে হুতিরা صنعاء (সানা) ও অন্যান্য অঞ্চলে হাজার হাজার সাধারণ নাগরিক ও তরুণদের নতুন করে বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করছে এবং ‘সাধারণ সংহতি বাহিনী’ গঠন করেছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী ওয়াশিংটনে তাদের বার্তা স্পষ্ট: "যুদ্ধে আসবেন না।"ট্রাম্পের বক্তব্য ও ওয়াশিংটনের সমীকরণডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "হুতিরা আমাদের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই সংঘাতে যুক্ত হোক।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, হুতিরা নির্দিষ্ট একটি দেশ ব্যতীত প্রায় সকল বাণিজ্যিক জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে এবং বিষয়টির একটি রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।আমেরিকা এই আঞ্চলিক সংকটে দূরবর্তী কোনো পক্ষ নয়। এটি এমন এক রাষ্ট্র, যার পতনের স্লোগান দিয়ে হুতিরা তাদের জনভিত্তি ধরে রাখে। কিন্তু যখন সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন হুতিরা তাদের নীতি নমনীয় করতে দ্বিধা করে না।হুতিরা স্থানীয় ইয়েমেনি প্রতিপক্ষ বা আঞ্চলিক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত চালিয়ে যেতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক শক্তি মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাদের নেই। বিশেষ করে বাব আল-মানদাব প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ১২% বাণিজ্য এবং ৭% জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। হুতিদের এই অঞ্চলে আধিপত্য বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলার পাশাপাশি ওয়াশিংটনকে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই ভয় থেকেই তাদের পেছনে যোগাযোগের এই পথ উন্মুক্ত করা।জনসমক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া রাজনৈতিক টিকিয়ে রাখার কৌশল হলেও, পর্দার আড়ালে মার্কিন শক্তিকে এড়িয়ে চলাই হুতিদের প্রধান সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনসমক্ষে 'আমেরিকার ধ্বংস' জপলেও পেছনে ওয়াশিংটনের কাছে অনুনয় হুতিদের