রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের শহীদদের লাশ গুমের অপচেষ্টা করা হয়েছিল: আল্লামা মামুনুল হক

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বর্বরোচিত ও নারকীয় হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনের অগ্রগতি জানতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়েছে হেফাজতে ইসলামের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। রোববার দুপুরে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক দাবি করেন, সে সময় ফ্যাসিবাদের নির্দেশে বহুসংখ্যক শহীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয়ভাবে গুম করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, যার কারণে অনেকের আজো হদিস মেলেনি।২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানী ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে ইসলাম ও প্রিয় নবী (সা.)-এর অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবিতে সমবেত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর পরিচালিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া গতিশীল হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এই প্রতিবেদনের অগ্রগতি জানতে এবং পর্যালোচনা করতে আজ রোববার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আসেন হেফাজতে ইসলামের একটি শীর্ষ দল। প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদ, যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার এবং মুফতি মীর ইদ্রিসসহ অন্য নেতারা।সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আল্লামা মামুনুল হক বলেন, "তদন্ত প্রতিবেদনে শুধুমাত্র যাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা গেছে, তাদের সংখ্যাটিই উঠে এসেছে। কিন্তু আমরা প্রথম থেকেই জোর দিয়ে বলে আসছি যে, শাপলা চত্বরের নির্মমতার শিকার অনেকেরই লাশ পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন স্বৈরাচারী ও উগ্র মানসিকতার শাসকগোষ্ঠী শাপলার শহীদদের মরদেহ গুম করার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালিয়েছিল। ফলে বহুসংখ্যক শহীদের কোনো হদিস মেলেনি এবং স্বাভাবিকভাবেই সেসব তথ্য এই খসড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে আনার সুযোগ ছিল না।"তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৫ মে'র সেই ঐতিহাসিক মহাসমাবেশটি ছিল সার্বজনীন। এতে সমাজের সব শ্রেণির ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সাধারণ শিক্ষার্থী, দ্বীনি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ তৎকালীন প্রায় সব বিরোধী ঘরানার রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও এই বর্বরোচিত গণহত্যার শিকার হয়ে শহীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।তদন্তের খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে এই হেফাজত নেতা বলেন, "আমরা এখন পর্যন্ত খসড়া প্রতিবেদনটি বিস্তারিত দেখার সুযোগ পাইনি। প্রাথমিকভাবে যতটুকু নজরে এসেছে, তাতে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আগামী দু-একদিনের মধ্যে এটি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করে আমাদের সংশোধনীগুলো প্রসিকিউশন টিমের কাছে হস্তান্তর করব। এরপরই আমরা আমাদের পূর্ণাঙ্গ সন্তুষ্টির বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানাতে পারব।"মামলাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তদন্তাধীন থাকায় চিফ প্রসিকিউটরের পরামর্শ অনুযায়ী অনেক বিষয় এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা সম্ভব নয় জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, "আমাদের মূল যে অভিযোগ ছিল, সে অনুযায়ী এই খসড়া প্রতিবেদনটি অনেকটাই কাছাকাছি ও ইতিবাচক রয়েছে বলে আমরা মনে করি।"এদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, শাপলা চত্বরের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিবিড় তদন্ত চালিয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত শেষে একটি খসড়া প্রতিবেদন আমাদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। একটি স্বচ্ছ, নির্ভুল এবং আন্তর্জাতিক মানের বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করতে প্রতিবেদনটি এখন চূড়ান্তভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, "তদন্ত প্রতিবেদনে ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন পুলিশ প্রধান (আইজিপি) এবং বিজিবি প্রধানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। আইনগত প্রক্রিয়ায় এগুলো আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে আসামিদের নাম সংযোজন বা বিয়োজন হতে পারে।"নিহতদের সংখ্যা ও পরিচয় প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম আরও যোগ করেন, "আমরা প্রাথমিকভাবে ৬১ জনের একটি তালিকা পেয়েছিলাম, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮ জন শহীদের সম্পূর্ণ পরিচয় নিশ্চিত ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। নিখোঁজ ও গুম হওয়াদের বিষয়েও আইনি অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।"বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত এই গণহত্যাটি বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হওয়াকে বিশ্বব্যাপী মজলুম মুসলমানদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের শহীদদের লাশ গুমের অপচেষ্টা করা হয়েছিল: আল্লামা মামুনুল হক