ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি পোশাক কারখানায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক শ্রমিককে প্রকাশ্যে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে প্রথমে মারধর, পরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর মরদেহে আগুন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ঘটনাটি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে এবং ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ হয়।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া এলাকায় অবস্থিত পাইওনিয়ার নিট কম্পোজিট (পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড) কারখানায় কর্মরত শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৮) ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও একই কারখানার শ্রমিক কামাল হোসেনের দাবি, দীপু চন্দ্র দাস মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেন। এ অভিযোগের পর তাকে কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নেওয়া হলে তিনি নাকি ওই বক্তব্যের কথা স্বীকার করেন। পরে তাকে ক্ষমা চাইতে বলা হলেও তিনি ক্ষমা চাননি—এমন দাবি করেছে কারখানার নিরাপত্তা কর্মী।
কারখানার সিকিউরিটি গার্ড ফিরোজ মিয়া বলেন, “দিপু চন্দ্র দাসকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। কিন্তু তিনি ক্ষমা চাননি। বিষয়টি কারখানার ভেতরে ও বাইরে জানাজানি হলে লোকজন গেইটের সামনে জড়ো হয়ে ভাঙচুর শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাকে জনতার হাতে তুলে দেয়।”
অভিযোগ অনুযায়ী, কারখানার বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে দীপুকে মারধর করা হয়। এরপর গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ধারাবাহিকভাবে পিটিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যুর পর মরদেহ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ভালুকা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আব্দুল মালেক জানান, রাত আড়াইটার দিকে অর্ধপোড়া মরদেহ উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহত দীপু চন্দ্র দাস জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের বাসিন্দা রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি দুই বছর ধরে ওই কারখানায় কর্মরত ছিলেন। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার ঘটনাটি সাজানো এবং এর পেছনে শ্রমিক–মালিক বিরোধ রয়েছে।
নিহতের বোন চম্পা দাস বলেন, “উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আমার ভাইয়ের বিরোধের কথা শুনেছি। সেই কারণেই মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমার ভাই বিএ পাস, সে বাটন মোবাইল ব্যবহার করত। ধর্ম সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। নবীকে নিয়ে কটূক্তি করার মতো মানুষ সে নয়।”
নিহতের বাবা রবি চন্দ্র দাস বলেন, “দিপুই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করলে দেশে তো আইন আছে, বিচার হতো আইনের মাধ্যমে। আমরা গরিব বলেই কি ছেলের জীবন রক্ষা করা গেল না?”
নিহতের স্ত্রী মেঘনা রানী বলেন, “আমার একমাত্র সন্তান আজ বাবা হারিয়েছে। এই অভাবের সংসার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবো জানি না। রাষ্ট্রের কাছে একটাই দাবি—এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার হোক।”
এ বিষয়ে কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে গেইটে গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ভালুকা মডেল থানার ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, “শতশত মানুষের ভিড় থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে মামলা নেওয়া হবে।”
বিষয় : ধর্ম অবমাননা

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি পোশাক কারখানায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক শ্রমিককে প্রকাশ্যে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে প্রথমে মারধর, পরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর মরদেহে আগুন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ঘটনাটি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে এবং ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ হয়।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া এলাকায় অবস্থিত পাইওনিয়ার নিট কম্পোজিট (পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড) কারখানায় কর্মরত শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৮) ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও একই কারখানার শ্রমিক কামাল হোসেনের দাবি, দীপু চন্দ্র দাস মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেন। এ অভিযোগের পর তাকে কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নেওয়া হলে তিনি নাকি ওই বক্তব্যের কথা স্বীকার করেন। পরে তাকে ক্ষমা চাইতে বলা হলেও তিনি ক্ষমা চাননি—এমন দাবি করেছে কারখানার নিরাপত্তা কর্মী।
কারখানার সিকিউরিটি গার্ড ফিরোজ মিয়া বলেন, “দিপু চন্দ্র দাসকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। কিন্তু তিনি ক্ষমা চাননি। বিষয়টি কারখানার ভেতরে ও বাইরে জানাজানি হলে লোকজন গেইটের সামনে জড়ো হয়ে ভাঙচুর শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাকে জনতার হাতে তুলে দেয়।”
অভিযোগ অনুযায়ী, কারখানার বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে দীপুকে মারধর করা হয়। এরপর গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ধারাবাহিকভাবে পিটিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যুর পর মরদেহ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ভালুকা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আব্দুল মালেক জানান, রাত আড়াইটার দিকে অর্ধপোড়া মরদেহ উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহত দীপু চন্দ্র দাস জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের বাসিন্দা রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি দুই বছর ধরে ওই কারখানায় কর্মরত ছিলেন। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার ঘটনাটি সাজানো এবং এর পেছনে শ্রমিক–মালিক বিরোধ রয়েছে।
নিহতের বোন চম্পা দাস বলেন, “উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আমার ভাইয়ের বিরোধের কথা শুনেছি। সেই কারণেই মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আমার ভাই বিএ পাস, সে বাটন মোবাইল ব্যবহার করত। ধর্ম সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। নবীকে নিয়ে কটূক্তি করার মতো মানুষ সে নয়।”
নিহতের বাবা রবি চন্দ্র দাস বলেন, “দিপুই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করলে দেশে তো আইন আছে, বিচার হতো আইনের মাধ্যমে। আমরা গরিব বলেই কি ছেলের জীবন রক্ষা করা গেল না?”
নিহতের স্ত্রী মেঘনা রানী বলেন, “আমার একমাত্র সন্তান আজ বাবা হারিয়েছে। এই অভাবের সংসার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবো জানি না। রাষ্ট্রের কাছে একটাই দাবি—এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার হোক।”
এ বিষয়ে কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে গেইটে গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ভালুকা মডেল থানার ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, “শতশত মানুষের ভিড় থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে মামলা নেওয়া হবে।”

আপনার মতামত লিখুন