শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে আগ্রাসী ভূমিকায় দখলদার বাহিনী; চরম মানবিক সংকটে ২১ হাজার মানুষ।

পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ: দুই মাসে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ফিলিস্তিনি ৩১২ স্থাপনা


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ: দুই মাসে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ফিলিস্তিনি ৩১২ স্থাপনা

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের পৈত্রিক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্যে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ইসরায়েলি বাহিনী ৩১২টি ঘরবাড়ি ও কৃষি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।

ইসরায়েলি সামরিক প্রশাসন এবং সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সাধারণত এই ধ্বংসলীলার পেছনে আইনি বৈধতার যুক্তি দিয়ে থাকে। তাদের দাবি অনুযায়ী, পশ্চিমতীরের 'সি জোন' (Area C)-এ নির্মিত এই স্থাপনাগুলো কোনো বৈধ 'বিল্ডিং পারমিট' বা নির্মাণ অনুমতি ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিকল্পনাবিহীন বসতি রুখতে তারা এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। অনেক ক্ষেত্রে একে 'অবৈধ কাঠামো উচ্ছেদ' হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য এই অনুমতি পাওয়া কার্যত অসম্ভব করে রাখা হয়েছে, যেখানে একই অঞ্চলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

'কুদ্স লিগ্যাল এইড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সেন্টার'-এর প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (OCHA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি বাহিনী ৩১২টি ঘরবাড়ি ও কৃষি স্থাপনা ধ্বংস করেছে।

ক্ষয়ক্ষতির তথ্য:

  • এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে সরাসরি প্রায় ২১,০০০ ফিলিস্তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
  • অধিকাংশ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে 'সি জোন'-এ, যা পশ্চিমতীরের মোট ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং সম্পূর্ণ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে।
  • ১৬ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে উগ্রপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ৬০টি ফিলিস্তিনি জনপদে অন্তত ৮৬টি হামলা চালিয়েছে। এতে ১৮৬ জন বাস্তুচ্যুত এবং ৬৪ জন আহত হয়েছেন।
  • হামলাকারীরা ৩৯টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের আয়ের প্রধান উৎস প্রায় ৮০০টি জয়তুন (অলিভ) গাছ উপড়ে ফেলেছে।

১৯৯৫ সালের ওসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমতীরকে এ, বি এবং সি—এই তিন ভাগে ভাগ করা হলেও, বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী 'সি' জোনে ফিলিস্তিনি অস্তিত্ব মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করেছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই উচ্ছেদ অভিযান কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দখলদার শক্তি অধিকৃত অঞ্চলের বেসামরিক জনগণের সম্পদ ধ্বংস বা তাদের জোরপূর্বক স্থানান্তর করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের নির্মাণকাজে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা আর বিপরীতে আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ ঘোষিত ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ করা এক চরম বৈষম্যমূলক ও অন্যায় নীতি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিশ্চুপ ভূমিকা এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছে। অথচ ফিলিস্তিনিদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এই পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। বিশ্ব বিবেককে আজ প্রশ্ন করতে হবে, নিজ ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের এই বিচারহীন উচ্ছেদের শেষ কোথায়?

বিষয় : পশ্চিমতীর

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ: দুই মাসে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ফিলিস্তিনি ৩১২ স্থাপনা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের পৈত্রিক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্যে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ইসরায়েলি বাহিনী ৩১২টি ঘরবাড়ি ও কৃষি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।

ইসরায়েলি সামরিক প্রশাসন এবং সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সাধারণত এই ধ্বংসলীলার পেছনে আইনি বৈধতার যুক্তি দিয়ে থাকে। তাদের দাবি অনুযায়ী, পশ্চিমতীরের 'সি জোন' (Area C)-এ নির্মিত এই স্থাপনাগুলো কোনো বৈধ 'বিল্ডিং পারমিট' বা নির্মাণ অনুমতি ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিকল্পনাবিহীন বসতি রুখতে তারা এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। অনেক ক্ষেত্রে একে 'অবৈধ কাঠামো উচ্ছেদ' হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য এই অনুমতি পাওয়া কার্যত অসম্ভব করে রাখা হয়েছে, যেখানে একই অঞ্চলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

'কুদ্স লিগ্যাল এইড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সেন্টার'-এর প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (OCHA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি বাহিনী ৩১২টি ঘরবাড়ি ও কৃষি স্থাপনা ধ্বংস করেছে।

ক্ষয়ক্ষতির তথ্য:

  • এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে সরাসরি প্রায় ২১,০০০ ফিলিস্তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
  • অধিকাংশ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে 'সি জোন'-এ, যা পশ্চিমতীরের মোট ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং সম্পূর্ণ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে।
  • ১৬ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে উগ্রপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ৬০টি ফিলিস্তিনি জনপদে অন্তত ৮৬টি হামলা চালিয়েছে। এতে ১৮৬ জন বাস্তুচ্যুত এবং ৬৪ জন আহত হয়েছেন।
  • হামলাকারীরা ৩৯টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের আয়ের প্রধান উৎস প্রায় ৮০০টি জয়তুন (অলিভ) গাছ উপড়ে ফেলেছে।

১৯৯৫ সালের ওসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমতীরকে এ, বি এবং সি—এই তিন ভাগে ভাগ করা হলেও, বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী 'সি' জোনে ফিলিস্তিনি অস্তিত্ব মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করেছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই উচ্ছেদ অভিযান কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দখলদার শক্তি অধিকৃত অঞ্চলের বেসামরিক জনগণের সম্পদ ধ্বংস বা তাদের জোরপূর্বক স্থানান্তর করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের নির্মাণকাজে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা আর বিপরীতে আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ ঘোষিত ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ করা এক চরম বৈষম্যমূলক ও অন্যায় নীতি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিশ্চুপ ভূমিকা এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছে। অথচ ফিলিস্তিনিদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এই পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। বিশ্ব বিবেককে আজ প্রশ্ন করতে হবে, নিজ ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের এই বিচারহীন উচ্ছেদের শেষ কোথায়?


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত