থাইল্যান্ড থেকে জোরপূর্বক চীনে ফেরত পাঠানো ৪০ জন উইঘুর মুসলিম পুরুষের অবস্থান, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও জীবিত থাকার তথ্য এক বছর পরও অজানা রয়ে গেছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং চীনা সরকারের সমালোচক বা জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত বৃহত্তর “আন্তর্জাতিক দমননীতির” অংশ।
জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থাই কর্তৃপক্ষ চীনা সরকারের তীব্র চাপের মুখে ৪০ জন উইঘুর পুরুষকে জোর করে চীনে ফেরত পাঠায়। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের “নন-রিফাউলমেন্ট” নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
“নন-রিফাউলমেন্ট” হলো আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইন, যার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার নির্যাতন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রত্যাবাসনের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গুম, নির্যাতন এবং স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রাণনাশের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়েছেন।
ব্যাংককে এক দশকের বেশি আটক
প্রত্যাবাসনের আগে ওই ৪০ জনকে ব্যাংককের সুয়ান ফ্লু ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটক রাখা হয়েছিল। পরিবার, আইনজীবী বা বাইরের কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। আটক অবস্থার পরিবেশও ছিল নিম্নমানের বলে জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাগ্য, অবস্থান বা স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত, পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারগুলোর কেউই তাদের প্রিয়জনদের কাছ থেকে কোনো বার্তা পাননি। কোথায় আটক রাখা হয়েছে, তারা জীবিত আছেন কিনা—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্যও নেই।
পরিবারগুলোর ওপর নজরদারি ও ভীতি
বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বস্ত প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, চীনা কর্তৃপক্ষ আটক ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। তাদের চলাফেরা, যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এর ফলে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক পরিবার প্রতিশোধের আশঙ্কায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ নিতে বা প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, “আইনজীবীর প্রবেশাধিকার অস্বীকার এবং পরিবারকে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন অদৃশ্য ও জবাবদিহিহীন থেকে যেতে পারে।”
চীন ও থাইল্যান্ডের প্রতি আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ওই ৪০ জন উইঘুর প্রত্যাবাসিত ব্যক্তির নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের অবাধ ও ব্যক্তিগত প্রবেশাধিকার দিতে।
একই সঙ্গে থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশকে উইঘুরদের চীনে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও নন-রিফাউলমেন্ট নীতি জোরদার ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমননীতির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কারা এই বিশেষজ্ঞরা
এই বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের বিশেষ প্রক্রিয়ার অধীনে নিয়োজিত স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন জোরপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃত গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ, স্বেচ্ছাচারী আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক, সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক এবং ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক।
তারা জাতিসংঘের কর্মী নন এবং স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। তাদের মতামত ব্যক্তিগত এবং তা জাতিসংঘ বা মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে অপরিহার্যভাবে প্রতিফলিত করে না।
বিষয় : চীন উইঘুর থাইল্যান্ড

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
থাইল্যান্ড থেকে জোরপূর্বক চীনে ফেরত পাঠানো ৪০ জন উইঘুর মুসলিম পুরুষের অবস্থান, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও জীবিত থাকার তথ্য এক বছর পরও অজানা রয়ে গেছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং চীনা সরকারের সমালোচক বা জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত বৃহত্তর “আন্তর্জাতিক দমননীতির” অংশ।
জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থাই কর্তৃপক্ষ চীনা সরকারের তীব্র চাপের মুখে ৪০ জন উইঘুর পুরুষকে জোর করে চীনে ফেরত পাঠায়। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের “নন-রিফাউলমেন্ট” নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
“নন-রিফাউলমেন্ট” হলো আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইন, যার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার নির্যাতন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রত্যাবাসনের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গুম, নির্যাতন এবং স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রাণনাশের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়েছেন।
ব্যাংককে এক দশকের বেশি আটক
প্রত্যাবাসনের আগে ওই ৪০ জনকে ব্যাংককের সুয়ান ফ্লু ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটক রাখা হয়েছিল। পরিবার, আইনজীবী বা বাইরের কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। আটক অবস্থার পরিবেশও ছিল নিম্নমানের বলে জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, চীনের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাগ্য, অবস্থান বা স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত, পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারগুলোর কেউই তাদের প্রিয়জনদের কাছ থেকে কোনো বার্তা পাননি। কোথায় আটক রাখা হয়েছে, তারা জীবিত আছেন কিনা—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্যও নেই।
পরিবারগুলোর ওপর নজরদারি ও ভীতি
বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বস্ত প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, চীনা কর্তৃপক্ষ আটক ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। তাদের চলাফেরা, যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এর ফলে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক পরিবার প্রতিশোধের আশঙ্কায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ নিতে বা প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, “আইনজীবীর প্রবেশাধিকার অস্বীকার এবং পরিবারকে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন অদৃশ্য ও জবাবদিহিহীন থেকে যেতে পারে।”
চীন ও থাইল্যান্ডের প্রতি আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ওই ৪০ জন উইঘুর প্রত্যাবাসিত ব্যক্তির নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের অবাধ ও ব্যক্তিগত প্রবেশাধিকার দিতে।
একই সঙ্গে থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশকে উইঘুরদের চীনে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও নন-রিফাউলমেন্ট নীতি জোরদার ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমননীতির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কারা এই বিশেষজ্ঞরা
এই বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের বিশেষ প্রক্রিয়ার অধীনে নিয়োজিত স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন জোরপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃত গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ, স্বেচ্ছাচারী আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক, সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক এবং ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক।
তারা জাতিসংঘের কর্মী নন এবং স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। তাদের মতামত ব্যক্তিগত এবং তা জাতিসংঘ বা মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে অপরিহার্যভাবে প্রতিফলিত করে না।

আপনার মতামত লিখুন