ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত আরও দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। বুধবার রাতে পরিচালিত অভিযানে সিয়াম ও আবদুল্লাহ নামের দুই যুবককে গ্রেফতারের পর এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে।
পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের কর্মী দীপু চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে পবিত্র ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে কারখানার একদল শ্রমিক ও স্থানীয় কিছু ব্যক্তি। তাদের দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্ত দীপু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তারা তাৎক্ষণিক উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গ্রেফতারকৃত সিয়াম আহম্মেদ (১৯) এবং আবদুল্লাহ (২৮) সহ একদল ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে জনতাকে উত্তেজিত করতে স্লোগান দেন। পুলিশের ভাষ্যমতে, অভিযুক্তরা কেবল উপস্থিতই ছিলেন না, বরং মরদেহ মহাসড়কের বিভাজকের গাছে ঝুলিয়ে রাখা এবং সেখানে লাঞ্ছনা করার প্রক্রিয়ায় সরাসরি ইন্ধন জুগিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকায়। নিহিত দীপু চন্দ্র দাস ওই এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে প্রথমে কারখানার ভেতরে ও পরে বাইরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়; হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ কারখানা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাস্তার পাশের একটি গাছে মরদেহ ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় সিয়াম ও আবদুল্লাহকে শনাক্ত করা হয়েছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, "গ্রেফতারকৃতরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে রশি টেনে স্লোগান দেন এবং উপস্থিত জনতাকে উত্তেজিত করে মরদেহের ওপর নির্যাতনে উৎসাহিত করেন।" এই ঘটনায় নিহতের ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন।
ইসলামের মৌলিক বিচার ব্যবস্থার মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া নিজ হাতে আইন তুলে নিতে পারে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির একটি চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
ইসলামিক স্কলার এবং সচেতন আলেম সমাজ মনে করেন, ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপরাধ প্রমাণের আগে কাউকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা ইসলামের সুমহান নীতির পরিপন্থী। এই মামলায় এ পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেফতার এবং ১২ জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আইনি প্রক্রিয়ার ইতিবাচক অগ্রগতি নির্দেশ করে। তবে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আবেগের বশবর্তী হয়ে বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে আইনের অমর্যাদা করার সাহস না পায়।
বিষয় : মব জাস্টিস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬
ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত আরও দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। বুধবার রাতে পরিচালিত অভিযানে সিয়াম ও আবদুল্লাহ নামের দুই যুবককে গ্রেফতারের পর এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে।
পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের কর্মী দীপু চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে পবিত্র ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে কারখানার একদল শ্রমিক ও স্থানীয় কিছু ব্যক্তি। তাদের দাবি অনুযায়ী, অভিযুক্ত দীপু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তারা তাৎক্ষণিক উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গ্রেফতারকৃত সিয়াম আহম্মেদ (১৯) এবং আবদুল্লাহ (২৮) সহ একদল ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে জনতাকে উত্তেজিত করতে স্লোগান দেন। পুলিশের ভাষ্যমতে, অভিযুক্তরা কেবল উপস্থিতই ছিলেন না, বরং মরদেহ মহাসড়কের বিভাজকের গাছে ঝুলিয়ে রাখা এবং সেখানে লাঞ্ছনা করার প্রক্রিয়ায় সরাসরি ইন্ধন জুগিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকায়। নিহিত দীপু চন্দ্র দাস ওই এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে প্রথমে কারখানার ভেতরে ও পরে বাইরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়; হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ কারখানা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাস্তার পাশের একটি গাছে মরদেহ ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় সিয়াম ও আবদুল্লাহকে শনাক্ত করা হয়েছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, "গ্রেফতারকৃতরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে রশি টেনে স্লোগান দেন এবং উপস্থিত জনতাকে উত্তেজিত করে মরদেহের ওপর নির্যাতনে উৎসাহিত করেন।" এই ঘটনায় নিহতের ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন।
ইসলামের মৌলিক বিচার ব্যবস্থার মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া নিজ হাতে আইন তুলে নিতে পারে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির একটি চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
ইসলামিক স্কলার এবং সচেতন আলেম সমাজ মনে করেন, ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপরাধ প্রমাণের আগে কাউকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা ইসলামের সুমহান নীতির পরিপন্থী। এই মামলায় এ পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেফতার এবং ১২ জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আইনি প্রক্রিয়ার ইতিবাচক অগ্রগতি নির্দেশ করে। তবে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আবেগের বশবর্তী হয়ে বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে আইনের অমর্যাদা করার সাহস না পায়।

আপনার মতামত লিখুন