বিশ্বজুড়ে যখন সাড়ম্বরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে, তখন অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনী নারীদের জীবন কাটছে ধ্বংসস্তূপ আর তপ্ত বালুর ওপর টানানো জীর্ণ তাঁবুতে। গত দুই বছর ধরে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজার নারীরা হারিয়েছেন তাঁদের আশ্রয়, সন্তান এবং জীবনসঙ্গীকে। আজ তাঁরা কেবল শোকাতুর মা বা স্ত্রী নন, বরং চরম অভাব আর অনাহারের মাঝে কয়েক লাখ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ও অভিভাবক হিসেবে বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) এবং দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে গাজায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযানকে "সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, বেসামরিক এলাকায় হামাসের উপস্থিতি ও অবকাঠামো ধ্বংস করতেই তারা এই অভিযান পরিচালনা করেছে। ইসরায়েলি সূত্রগুলো বারবার উল্লেখ করেছে যে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকটের জন্য সরাসরি দায়ী হামাস, যারা জনবহুল এলাকাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে তেল আবিবের পক্ষ থেকে গাজায় নারীদের ওপর যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নেমে এসেছে, সেটিকে সরাসরি 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে স্বীকার না করে বরং সামরিক কৌশলের অনিবার্য ফল হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিক মহলের ত্রাণ সরবরাহের চাপের মুখেও ইসরায়েল দাবি করেছে যে, তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ মানবিক সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে, যদিও মাঠপর্যায়ের চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি "গণহত্যামূলক যুদ্ধ" আজ দুই বছর পূর্ণ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এক গণকবরে। ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হওয়ার পাশাপাশি গাজার ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি এবং গাজার নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ১২,৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনী নারী, যাদের মধ্যে ৯,০০০ জনই ছিলেন মমতাময়ী মা।
পরিসংখ্যানের আয়নায় গাজার ভয়াবহতা:
গাজার একজন প্রত্যক্ষদর্শী নারী সুমাইয়া (ছদ্মনাম) জানান,
"আমরা এখন কেবল বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছি না, আমরা লড়াই করছি আমাদের সন্তানদের চোখের সামনে না খেয়ে মরতে দেখা বন্ধ করার জন্য। আমাদের পুরুষরা শহীদ হয়েছেন, এখন পুরো সংসারের বোঝা আমাদের কাঁধে, অথচ আমাদের চারপাশ ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছু নেই।"
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা গাজার এই পরিস্থিতিকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 'ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন' (IPC)-এর তথ্যানুযায়ী, গাজায় দুর্ভিক্ষ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় বেসামরিক নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা দখলদার শক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা। কিন্তু গত দুই বছরের চিত্র বলছে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ত্রাণ বহরে হামলা চালিয়ে যুদ্ধাপরাধের সীমা লঙ্ঘন করেছে।
এই পরিকল্পিত গণহত্যার সাথে জড়িতদের আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। গাজার নারীদের এই বিসর্জন কেবল একটি ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং এটি নারী মর্যাদার ওপর এক চরম আঘাত। বিশ্ব মুসলিম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর দায়িত্ব বর্তায় এই অসহায় মা-বোনদের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার এবং গাজায় স্থায়ী শান্তি ও পুনর্গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখা। দায়বদ্ধতাহীন কোনো শান্তি আলোচনা গাজার এই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারবে না।
বিষয় : ফিলিস্তিন

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মার্চ ২০২৬
বিশ্বজুড়ে যখন সাড়ম্বরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে, তখন অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনী নারীদের জীবন কাটছে ধ্বংসস্তূপ আর তপ্ত বালুর ওপর টানানো জীর্ণ তাঁবুতে। গত দুই বছর ধরে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজার নারীরা হারিয়েছেন তাঁদের আশ্রয়, সন্তান এবং জীবনসঙ্গীকে। আজ তাঁরা কেবল শোকাতুর মা বা স্ত্রী নন, বরং চরম অভাব আর অনাহারের মাঝে কয়েক লাখ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ও অভিভাবক হিসেবে বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) এবং দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে গাজায় তাদের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযানকে "সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, বেসামরিক এলাকায় হামাসের উপস্থিতি ও অবকাঠামো ধ্বংস করতেই তারা এই অভিযান পরিচালনা করেছে। ইসরায়েলি সূত্রগুলো বারবার উল্লেখ করেছে যে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকটের জন্য সরাসরি দায়ী হামাস, যারা জনবহুল এলাকাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে তেল আবিবের পক্ষ থেকে গাজায় নারীদের ওপর যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নেমে এসেছে, সেটিকে সরাসরি 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে স্বীকার না করে বরং সামরিক কৌশলের অনিবার্য ফল হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিক মহলের ত্রাণ সরবরাহের চাপের মুখেও ইসরায়েল দাবি করেছে যে, তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ মানবিক সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে, যদিও মাঠপর্যায়ের চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি "গণহত্যামূলক যুদ্ধ" আজ দুই বছর পূর্ণ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এক গণকবরে। ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হওয়ার পাশাপাশি গাজার ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি এবং গাজার নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুই বছরে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ১২,৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনী নারী, যাদের মধ্যে ৯,০০০ জনই ছিলেন মমতাময়ী মা।
পরিসংখ্যানের আয়নায় গাজার ভয়াবহতা:
গাজার একজন প্রত্যক্ষদর্শী নারী সুমাইয়া (ছদ্মনাম) জানান,
"আমরা এখন কেবল বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছি না, আমরা লড়াই করছি আমাদের সন্তানদের চোখের সামনে না খেয়ে মরতে দেখা বন্ধ করার জন্য। আমাদের পুরুষরা শহীদ হয়েছেন, এখন পুরো সংসারের বোঝা আমাদের কাঁধে, অথচ আমাদের চারপাশ ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছু নেই।"
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা গাজার এই পরিস্থিতিকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 'ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন' (IPC)-এর তথ্যানুযায়ী, গাজায় দুর্ভিক্ষ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় বেসামরিক নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা দখলদার শক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা। কিন্তু গত দুই বছরের চিত্র বলছে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ত্রাণ বহরে হামলা চালিয়ে যুদ্ধাপরাধের সীমা লঙ্ঘন করেছে।
এই পরিকল্পিত গণহত্যার সাথে জড়িতদের আন্তর্জাতিক আদালতে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। গাজার নারীদের এই বিসর্জন কেবল একটি ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং এটি নারী মর্যাদার ওপর এক চরম আঘাত। বিশ্ব মুসলিম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর দায়িত্ব বর্তায় এই অসহায় মা-বোনদের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার এবং গাজায় স্থায়ী শান্তি ও পুনর্গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখা। দায়বদ্ধতাহীন কোনো শান্তি আলোচনা গাজার এই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারবে না।

আপনার মতামত লিখুন