বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

জার্মান পার্লামেন্টে কট্টরপন্থীদের ইসলামভীতি ছড়ানোর অপচেষ্টা: সালাম দিয়ে প্রতিবাদ নারী এমপির

জার্মানির ফেডারেল পার্লামেন্টে (বুন্দেসটাগ) অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষার দোহাই দিয়ে উগ্র ডানপন্থী দল এএফডি (AfD) কর্তৃক উত্থাপিত একটি ইসলামভীতিমূলক প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বামপন্থী এমপি মারিকে হারমেয়ার। গত বুধবার পার্লামেন্ট অধিবেশনে নিজের বক্তব্য শেষ করার সময় তিনি সুন্নাহসম্মত অভিবাদন ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে মুসলিমদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁর এই সাহসী অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে।জার্মানির উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (AfD) সম্প্রতি পার্লামেন্টে একটি আইনি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। তাদের প্রস্তাবের শিরোনাম ছিল— “ধর্মীয় নিপীড়ন, গুন্ডামি এবং গোষ্ঠীগত গতিশীল চাপ থেকে শিশু ও যুবকদের সুরক্ষা শক্তিশালীকরণ।” এএফডি-র দাবি অনুযায়ী, জার্মানির স্কুল ও সামাজিক বলয়গুলোতে মুসলিম কিশোর-তরুণরা ধর্মীয় অনুশাসনের দোহাই দিয়ে অন্যান্য শিশুদের ওপর ‘সাংস্কৃতিক চাপ’ সৃষ্টি করছে। তাদের ভাষ্যমতে, এটি এক ধরনের ‘ধর্মীয় উৎপীড়ন’, যা থেকে শিশুদের রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দলটির এই দাবি মূলত তথ্যভিত্তিক কোনো গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সুকৌশলে ইসলামি সংস্কৃতিকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করার একটি রাজনৈতিক চাল মাত্র।ঘটনাটি ঘটে গত ১ এপ্রিল বার্লিনে অবস্থিত জার্মান পার্লামেন্টের মূল অধিবেশনে। এএফডি-র প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে বামপন্থী দলের (Die Linke) সংসদ সদস্য মারিকে হারমেয়ার সরাসরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই প্রস্তাবের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ঘৃণা ও বৈষম্যকে উন্মোচিত করেন।তিনি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন:"এই প্রস্তাব শিশুদের সুরক্ষা দিচ্ছে না। বরং এটি অবিশ্বাসের বীজ বপন করছে এবং পরিকল্পিতভাবে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি উসকে দিচ্ছে। আপনারা (এএফডি) শিশুদেরকে আপনাদের মুসলিমবিদ্বেষী সাংস্কৃতিক যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আমরা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি।"বক্তব্য শেষে তিনি সরাসরি এএফডি সদস্যদের সারির দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করেন— “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।” (আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)। পার্লামেন্টের ভেতরে এই অভিবাদন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে এবং উগ্রবাদীদের প্রচারণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। উল্লেখ্য যে, জার্মানির ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যার ওপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক প্রস্তাবনাগুলো সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধি করছে এবং মুসলিম তরুণদের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জার্মান সংবিধানের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিশ্বাস পালনের অধিকার প্রশ্নাতীত। নির্ভরযোগ্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্ট বলছে, ইউরোপে শিশুদের ওপর কথিত ‘ধর্মীয় চাপের’ চেয়েও বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামভীতি’ এবং বর্ণবাদ।আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এএফডি-র প্রস্তাবটি মূলত ‘কালেক্টিভ পানিশমেন্ট’ বা সমষ্টিগত দণ্ডের একটি রূপ, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের সংস্কৃতিকে অপরাধ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি নাগরিক অধিকারের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে তার ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সুরক্ষা প্রদান করা। কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণামূলক আইন প্রণয়ন কেবল সামাজিক সম্প্রীতিই নষ্ট করে না, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেরও লঙ্ঘন। সংসদ সদস্য মারিকে হারমেয়ারের প্রতিবাদটি কেবল একজন ব্যক্তির প্রতিবাদ নয়, বরং এটি উগ্রবাদের বিপরীতে সহাবস্থান ও ইনসাফের লড়াইয়ের একটি প্রতীকী চিত্র। মুসলিম উম্মাহর এই সংকটময় সময়ে ইউরোপীয় রাজনীতির অন্দরমহল থেকে আসা এই প্রতিবাদী আওয়াজ ইনসাফকামী মানুষের মনে আশার আলো সঞ্চার করছে।

জার্মান পার্লামেন্টে কট্টরপন্থীদের ইসলামভীতি ছড়ানোর অপচেষ্টা: সালাম দিয়ে প্রতিবাদ নারী এমপির