ইয়েমেনের চলমান গৃহযুদ্ধে পুনরায় সংঘাত মারাত্মক রূপ নেওয়ায় শাবওয়া প্রদেশের একটি সরকারি নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ শিবিরে বিদ্রোহী হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ জনে পৌঁছেছে। স্থানীয় প্রাদেশিক সংবাদ মাধ্যম ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শাবওয়ার গভর্নর আওয়াদ আল-ওয়াজির জানিয়েছেন, আকস্মিক এই হামলায় ২০০ জনেরও বেশি সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যখন মাঠে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তিনটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত হানে। প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারীদের ধারণ করা ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, এলাকাটিতে রক্তাক্ত দেহ এবং আহতদের আর্তচিৎকার ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন যে, উক্ত প্রশিক্ষণ শিবিরটি সৌদির সামরিক বাহিনীর পরিচালনায় পরিচালিত হচ্ছিল। তবে হুথিদের এই দাবির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
উল্লেখ্য, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ 'বাব আল-মানদে' প্রণালীর নিকটবর্তী অঞ্চলগুলোর দিকে হুথি যোদ্ধারা অগ্রসর হতে শুরু করার পর থেকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার—যাকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সমর্থন দিচ্ছে—এবং হুথিদের মধ্যে পুনরায় তীব্র লড়াই শুরু হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের কাছাকাছি কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে হুথিরা বর্তমানে ইয়েমেনের দক্ষিণ পার্বত্য অঞ্চলের শেষ প্রধান শহর তাইজ ঘেরাও করে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের এই সংঘাত বর্তমানে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের একটি নতুন ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে। ইতিপূর্বে হুথিরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান 'সৌদি আরামকো'-র ওপর দূরপাল্লার আক্রমণ চালিয়েছিল।
যে শাবওয়া প্রদেশে এই হামলা চালানো হয়েছে, সেটি আদেন উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি জ্বালানি সমৃদ্ধ রাজ্য। এখানে ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় শিল্প বিনিয়োগ প্রকল্প 'বালহাফ' তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) প্ল্যান্ট অবস্থিত।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নিলে দেশটির তৎকালীন বৈধ সরকার দক্ষিণে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থার পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, যা চলতি বছরের শুরু পর্যন্ত কার্যকর ছিল। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার ফলে ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্টতম মানবিক সংকটে থাকা ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণের অবস্থা দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
মতামত