ঈমানের মাধুর্য মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি, আত্মতৃপ্তি ও জীবনে সুখ এনে দেয় বলে মন্তব্য করেছেন পবিত্র মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদ। ২৩ অক্টোবর শুক্রবার মক্কার মসজিদুল হারামে জুমার খুতবায় তিনি মুসলমানদের আল্লাহকে ভয় করা, একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ এবং সৎকাজে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দৃঢ় ঈমান মানুষকে দুশ্চিন্তা, হতাশা ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করে। বিপরীতে, ঈমানের দুর্বলতা মানুষের জীবনে অশান্তি, অসন্তোষ ও আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদ মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বন, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ মেনে চলা এবং কল্যাণকর কাজে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং ঈমানের মাধুর্য মানুষের মানসিক প্রশান্তি, হৃদয়ের স্থিরতা, আত্মতৃপ্তি ও জীবনে সুখ অর্জনের অন্যতম প্রধান উপায়।
শুক্রবারের খুতবায় তিনি বলেন, জীবনের বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, একদল মানুষ সুন্দর ও স্বস্তিদায়ক জীবনযাপন করেন। তাঁদের জীবনে কল্যাণের প্রাচুর্য থাকে। তাঁরা নিজেদের ও অন্যদের প্রতি উদার, হৃদয়ে নির্মল, বিদ্বেষমুক্ত এবং হাস্যোজ্জ্বল থাকেন। অন্যদিকে, আরেকদল মানুষ নানা ধরনের ক্লান্তি, দুর্ভোগ ও অসন্তোষে ভোগেন। তাঁরা অভিযোগ ও হতাশায় ডুবে থাকেন এবং নিরাপত্তা, নিশ্চিন্ততা, স্বস্তি ও সুখ হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের অন্তর থেকে সন্তুষ্টি ও প্রশান্তির অনুভূতি ক্রমেই বিলীন হয়ে যায়। এর কারণ হিসেবে তিনি মানুষের মনে জমে থাকা বিদ্বেষ, হিংসা, ঘৃণা, দুর্দশা ও স্বার্থপরতার কথা উল্লেখ করেন।
খতিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুই ধরনের মানুষের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো ঈমান এবং ঈমানের মাধুর্য। এই মাধুর্য মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি ও আত্মায় সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে। এর ফলে মানুষ স্বস্তি, নিশ্চিন্ততা ও মানসিক প্রশস্ততা অনুভব করে এবং অনিদ্রা, উদ্বেগ ও মানসিক সংকীর্ণতা থেকে দূরে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান আত্মার প্রশান্তি ও হৃদয়ের হেদায়াত। এটি সঠিক পথে চলা মানুষের আলোকবর্তিকা, হতাশ মানুষের আশা, ভীত মানুষের নিরাপত্তা, সংগ্রামরত মানুষের সহায়তা, মুত্তাকিদের সুসংবাদ এবং বঞ্চিত মানুষের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ। ঈমান মানুষের আত্মবিশ্বাস, জনগোষ্ঠীর প্রাণশক্তি এবং জাতির আশার উৎস।
ঈমানের মাধুর্য অর্জনের তিনটি পথ
খতিব ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদ বলেন, ঈমানের মাধুর্য ও প্রকৃত সুখ অর্জনের প্রথম পথ হলো আল্লাহকে প্রতিপালক ও সবকিছুর ব্যবস্থাপক হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়া। তিনি বলেন, আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের কাজের হিসাব ও পরিণতির ওপর কর্তৃত্বশীল। তিনি দুনিয়া ও আখিরাতের পরম দয়াময় ও করুণাময়, আসমান ও জমিনের চিরস্থায়ী ধারক ও নিয়ন্ত্রক এবং মৃত্যু, জীবন ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা। তিনি অসংখ্য নিয়ামত দান করেন, বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন, দুর্দশা দূর করেন, মানুষকে তাঁর অনুগ্রহ প্রদান করেন, পথভ্রষ্টতা থেকে সঠিক পথ দেখান এবং অজ্ঞতার পর জ্ঞান দান করেন।
ঈমানের মাধুর্যের দ্বিতীয় পথ হলো ইসলামকে নিজের দ্বীন হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। তিনি বলেন, ইসলাম আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ দ্বীন, যা তিনি তাঁর রাসুলের ওপর নাজিল করেছেন এবং তাঁর বান্দাদের জন্য মনোনীত করেছেন। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি সন্তুষ্টি মানুষের মধ্যে আস্থা ও প্রশান্তি তৈরি করে এবং জীবনের পরীক্ষা ও বিপদের মুখে অবিচল থাকতে সাহায্য করে, যতক্ষণ তার দ্বীন অটুট থাকে। তাঁর মতে, ইসলাম সন্তুষ্টি ও আলোর উৎস এবং সুখ ও সঠিক পথনির্দেশনার ভিত্তি।
ঈমানের মাধুর্যের তৃতীয় পথ হলো হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর রাসুল ও নবী হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা। খতিব তাঁকে বিশ্বস্ত উপদেষ্টা, মানবজাতির জন্য প্রেরিত রহমত এবং উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত সন্তুষ্টির প্রকাশ হলো তাঁর দেখানো পথে চলা, তাঁকে অনুসরণ করা, তাঁর সুন্নাহর আলোয় জীবন পরিচালনা করা এবং সেই সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা।
ঈমানের মাধুর্য বদলে দেয় জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি
খতিব বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের মাধুর্য আস্বাদন করতে পারেন, তাঁর জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। তিনি নিজের পথ চিনতে পারেন, সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা নিয়ে এগিয়ে যান, আত্মতৃপ্তি অর্জন করেন এবং নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ঈমানের মাধুর্য মানুষের অন্তরে আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালার প্রতি প্রশান্তি সৃষ্টি করে এবং জীবনে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোর প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে সাহায্য করে। ফলে পরিস্থিতি ও সময়ের পরিবর্তন সত্ত্বেও একজন মুমিন স্বস্তি, নিশ্চিন্ততা ও সুখের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, একজন মুমিন যা হারিয়েছেন, তা নিয়ে হতাশায় ভেঙে পড়েন না। আবার যা অর্জন করেছেন, তা নিয়ে অহংকার ও ঔদ্ধত্যে মেতে ওঠেন না। জীবনের পরিস্থিতি ও পরীক্ষাগুলো তাঁর মানসিক প্রশান্তি নষ্ট করতে পারে না কিংবা তাঁর ধৈর্য দুর্বল করে দিতে পারে না। সুখের সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং দুঃখ-কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
দৃঢ় ঈমান মানুষকে করে ধৈর্যশীল ও আত্মবিশ্বাসী
খতিবের মতে, দৃঢ় ঈমান মানুষকে ভয়, দুঃখ, অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করে। এটি আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁর ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী করে।
তিনি বলেন, একজন মুমিন আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু পেলে তা গ্রহণ করেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কিছু না পেলে সন্তুষ্ট থাকেন ও ধৈর্য ধারণ করেন। কোনো নির্দেশ পেলে দ্রুত তা পালন করেন এবং নিষেধ করা হলে তা থেকে বিরত থাকেন। আর কোনো গুনাহ করে ফেললে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
তিনি দুর্বল ঈমানের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ঈমান দুর্বল হলে মানুষ বিপদ-আপদে অতিরিক্ত অস্থির হয়ে পড়ে। কারণ, সে বিপদের প্রকৃত তাৎপর্য ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না। তার কাছে সফর ভীতিকর মনে হয়, কারণ সে প্রয়োজনীয় পাথেয়ের ব্যবস্থা করেনি। আবার সঠিক পথনির্দেশনা না থাকায় সে পথ হারিয়ে ফেলে।
ঈমানের অভাব সমাজে অস্থিরতা ও স্বার্থপরতা বাড়ায়
খতিব ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হুমাইদ বলেন, ঈমানের অনুপস্থিতি মানুষের জীবন ও কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তখন মানুষ নিজের কথা ও কাজের জন্য জবাবদিহির অনুভূতি ছাড়াই চলতে পারে। তার আচরণে স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পায় এবং নিজের ও অন্যদের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে যায়।
এর ফলে পারস্পরিক দয়া ও সহমর্মিতার জায়গায় সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয় এবং সহযোগিতার পরিবর্তে বিভক্তি দেখা দেয়। তিনি সতর্ক করেন, ঈমান ও তার মাধুর্য হারিয়ে গেলে মানুষ হিংস্র পশুর মতো আচরণ করতে পারে। এতে আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মানুষ নিজের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং জিন ও মানুষের মধ্যকার শয়তানদের প্ররোচনায় পরিচালিত হতে পারে।
মুসলমানদের প্রতি উপদেশ
খুতবায় শেষ পর্যায়ে মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব মুসলমানদের আবারও আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর প্রতি ঈমান দৃঢ় করা, রাসুলের আনুগত্য করা এবং দ্বীনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার উপদেশ দেন।
তিনি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে রাসুল ও নবী হিসেবে গ্রহণ করার সন্তুষ্টিবোধ নতুন করে জাগ্রত করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, ঈমানের মাধুর্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে প্রশান্তি ও আত্মতৃপ্তি আনার পাশাপাশি পারস্পরিক সহমর্মিতা, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মতামত