শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

মুসলিম উম্মাহর আত্মিক ঐক্যের ওপর জোর দিলেন মসজিদে নববির খতিব


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

মুসলিম উম্মাহর আত্মিক ঐক্যের ওপর জোর দিলেন মসজিদে নববির খতিব

সৌদি আরবের মদিনায় মসজিদে নববির ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুযাইফি বলেছেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এই কালিমাতুশ শাহাদাতের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করে তা কথা ও কাজে বাস্তবায়ন করা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মুসলিম উম্মাহকে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সংহতি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মসজিদে নববিতে জুমার খুতবায় তিনি কালিমাতুশ শাহাদাতের পবিত্রতা, মর্যাদা, তাৎপর্য ও গভীর অর্থ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মুসলমানরা যখন একই কালিমা উচ্চারণের মাধ্যমে নিজেদের ঈমানের ঐক্য প্রকাশ করেন, তখন তাদের উচিত সেই কালিমার শিক্ষা অনুসরণ করে কাজের ক্ষেত্রেও ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

তাওহিদ ইসলামের প্রথম ও মৌলিক শিক্ষা

খুতবায় শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে (সা.) সর্বপ্রথম তাঁর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক করাকে নিষিদ্ধ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করেন:

“বলুন, আমাকে তো নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করতে। আমি তাঁরই দিকে আহ্বান জানাই এবং তাঁর কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন।” (সূরা আর-রা‘দ, আয়াত ৩৬-এর ভাবার্থ)

তিনি বলেন, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.) সর্বপ্রথম মানুষকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর পরিচয় দিয়েছেন এবং তাঁর সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলি সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন।

ইমাম আল-হুযাইফি বলেন, ইসলামের প্রথম স্তম্ভের ভিত্তি হলো এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার অর্থে ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। এই কালিমা সব ধরনের ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনাকে প্রত্যাখ্যান করে।

অন্যদিকে, ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ সাক্ষ্যের অর্থ হলো, নির্বাচিত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আনুগত্য করা, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা জানিয়েছেন তা সত্য বলে মেনে নেওয়া, তাঁর নিষিদ্ধ কাজ ও পাপ থেকে বিরত থাকা এবং তিনি যে সুন্নাহর শিক্ষা দিয়েছেন, তার অনুসরণ করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা।

কালিমার শিক্ষা মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে

মসজিদে নববির ইমাম বলেন, কালিমাতুশ শাহাদাতের এই মহান শিক্ষা মানুষকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়, বরং এটি একটি নতুন, সুশৃঙ্খল ও সঠিক জীবনপদ্ধতি।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর দাবি হলো, মানুষ তার প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর কাছে করবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রার্থনা করা যাবে না। নৈকট্যপ্রাপ্ত কোনো ফেরেশতা, প্রেরিত কোনো নবী, কোনো ওলি, কবর, ফেরেশতা কিংবা জিনের কাছে ইবাদতমূলক প্রার্থনা করা যাবে না।

একইভাবে ভরসা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আশা, সাহায্যের আবেদন, সহযোগিতা প্রার্থনা, আশ্রয় চাওয়া এবং মানত করার মতো ইবাদতও একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা যাবে না।

তিনি বলেন, এই কালিমাতুশ শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরম দয়ালু, সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহই এই দুই সাক্ষ্যবাণী বিধিবদ্ধ করেছেন এবং এগুলোর ওপর ইসলামের স্তম্ভ, ঈমান ও ইহসানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইসলামের সব বিধিবিধানের ভিত্তিও এই মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

মুখের ঈমানের সঙ্গে কাজের মিল রাখার আহ্বান

মুসলমানদের উদ্দেশে শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, তারা যখন একই কালিমা উচ্চারণের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন, তখন তাদের উচিত এর অর্থ ও দাবি অনুযায়ী কাজের ক্ষেত্রেও ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

তিনি বলেন, কালিমাতুশ শাহাদাতের শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আকিদা ও আদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করা।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের দুটি আয়াত উল্লেখ করেন। প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহর জীবনে মুমিনদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাঁর নবীর মহান চরিত্রের প্রশংসা করেছেন।

ইমাম মুসলমানদের আহ্বান জানান, তারা যেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাস ও জীবনাচরণে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহর সাহাবি এবং উত্তমভাবে তাঁদের অনুসরণকারী তাবেঈদের আদর্শ ধারণ করেন।

তিনি সাহাবিদের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সেই আয়াতও উদ্ধৃত করেন, যেখানে মুহাজির ও আনসারদের অগ্রগামী অংশ এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের অনুসরণকারীদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

ইসলামের আকিদা ও চার মাজহাবের ইমামদের অবস্থান

শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত আকিদা মানুষকে বিদআত থেকে রক্ষা করার পথ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই আকিদাই ইসলামের আকিদা এবং চার মাজহাবের ফকিহ ইমামরাও এই মৌলিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

তিনি বলেন, আল্লাহর সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলিগুলোকে স্বীকার করতে হবে। তাঁর সত্তাগত ও কর্মগত গুণাবলির বাস্তবতা স্বীকার করার পাশাপাশি এসব গুণের প্রকৃত ধরন বা পদ্ধতি মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে বলে মেনে নিতে হবে। মানুষের বিবেক ও বুদ্ধি আল্লাহর গুণাবলির প্রকৃত স্বরূপ পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও পারস্পরিক সংহতির ওপর গুরুত্বারোপ

খুতবায় ইমাম আল-হুযাইফি মুসলমানদের ভাষা, ইতিহাস ও কিবলার অভিন্নতার কথাও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, মুসলমানরা সেই আরবি ভাষায় আল্লাহর ইবাদত করেন, যে ভাষায় তাঁরা নামাজে কোরআন তিলাওয়াত করেন। আল্লাহ পৃথিবীতে নবুয়তের ধারার সূচনা করার পর থেকে মুসলমানদের একটি অভিন্ন ধর্মীয় ইতিহাস রয়েছে। একইভাবে তাঁরা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কাবাকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করে একই দিকে মুখ করে ইবাদত করেন।

তিনি বলেন, এই অভিন্নতার ভিত্তিতে মুসলমানদের উচিত শক্তি, ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করা এবং বিভেদ ও মতবিরোধ পরিহার করা।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করেন:

“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মাহ এক উম্মাহ এবং আমিই তোমাদের রব। অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত করো।” (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৯২-এর ভাবার্থ)

সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা ও সহমর্মিতা জরুরি

শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, ইসলামের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোনো বিপদ, দুর্যোগ কিংবা কঠিন পরিস্থিতি দেখা দিলে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, একে অন্যকে সমর্থন এবং দয়া-মমতা ছাড়া তা দূর করা বা সমাধান করা কঠিন।

তিনি বলেন, ইসলামের বিধিবিধান মানবজাতির জন্য কল্যাণকর। তবে যাদের উদ্দেশ্য অসৎ, তারা এসব বিধান ও কল্যাণকর উদ্যোগকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারে। তারা বিভিন্ন উপায়ে অপপ্রচার, সন্দেহ সৃষ্টি এবং মানুষের মধ্যে বাধা তৈরি করে ভালো উদ্যোগগুলোকে ব্যাহত করার চেষ্টা করে।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের দুটি আয়াত উল্লেখ করেন। একটি আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পরাক্রমশালী, যদিও অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। অন্য আয়াতে মুসলমানদের সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে এবং বিভক্ত না হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় মুসলমানরা পরস্পরের শত্রু ছিল। পরে আল্লাহ তাদের অন্তরে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেন এবং তাঁর অনুগ্রহে তারা ভাইয়ে ভাইয়ে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে এই ঐক্যকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যের সহযোগী হওয়ার আহ্বান

জুমার খুতবায় শায়খ আলী আল-হুযাইফি মুসলমানদের মধ্যে দয়া, সহযোগিতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করা মুমিন নারী ও পুরুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তিনি পবিত্র কোরআনের সেই আয়াত উদ্ধৃত করেন, যেখানে বলা হয়েছে, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অন্যের সহযোগী ও অভিভাবক। তাঁরা সৎকাজের নির্দেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, নামাজ প্রতিষ্ঠা করেন, জাকাত দেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করেন।

আয়াতটিতে আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন। তিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ মুমিন নারী ও পুরুষকে এমন জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং পবিত্র আবাসে বসবাস করবে। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, আর সেটিই মহাসাফল্য।

খুতবায় ইমাম আল-হুযাইফির মূল বক্তব্য ছিল, মুসলমানদের ঈমানের অভিন্ন ঘোষণা যেন বাস্তব জীবনে ঐক্য, সহমর্মিতা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। বিভেদ পরিহার করে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণের মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মাহর সংহতি আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।

বিষয় : সৌদি আরব মসজিদে নববী মদিনা মুনাওয়ারাহ

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬


মুসলিম উম্মাহর আত্মিক ঐক্যের ওপর জোর দিলেন মসজিদে নববির খতিব

প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সৌদি আরবের মদিনায় মসজিদে নববির ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুযাইফি বলেছেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এই কালিমাতুশ শাহাদাতের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করে তা কথা ও কাজে বাস্তবায়ন করা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মুসলিম উম্মাহকে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সংহতি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মসজিদে নববিতে জুমার খুতবায় তিনি কালিমাতুশ শাহাদাতের পবিত্রতা, মর্যাদা, তাৎপর্য ও গভীর অর্থ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মুসলমানরা যখন একই কালিমা উচ্চারণের মাধ্যমে নিজেদের ঈমানের ঐক্য প্রকাশ করেন, তখন তাদের উচিত সেই কালিমার শিক্ষা অনুসরণ করে কাজের ক্ষেত্রেও ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

তাওহিদ ইসলামের প্রথম ও মৌলিক শিক্ষা

খুতবায় শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে (সা.) সর্বপ্রথম তাঁর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক করাকে নিষিদ্ধ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করেন:

“বলুন, আমাকে তো নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করতে। আমি তাঁরই দিকে আহ্বান জানাই এবং তাঁর কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন।” (সূরা আর-রা‘দ, আয়াত ৩৬-এর ভাবার্থ)

তিনি বলেন, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.) সর্বপ্রথম মানুষকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর পরিচয় দিয়েছেন এবং তাঁর সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলি সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন।

ইমাম আল-হুযাইফি বলেন, ইসলামের প্রথম স্তম্ভের ভিত্তি হলো এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার অর্থে ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। এই কালিমা সব ধরনের ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনাকে প্রত্যাখ্যান করে।

অন্যদিকে, ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ সাক্ষ্যের অর্থ হলো, নির্বাচিত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আনুগত্য করা, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা জানিয়েছেন তা সত্য বলে মেনে নেওয়া, তাঁর নিষিদ্ধ কাজ ও পাপ থেকে বিরত থাকা এবং তিনি যে সুন্নাহর শিক্ষা দিয়েছেন, তার অনুসরণ করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা।

কালিমার শিক্ষা মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে

মসজিদে নববির ইমাম বলেন, কালিমাতুশ শাহাদাতের এই মহান শিক্ষা মানুষকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়, বরং এটি একটি নতুন, সুশৃঙ্খল ও সঠিক জীবনপদ্ধতি।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর দাবি হলো, মানুষ তার প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর কাছে করবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রার্থনা করা যাবে না। নৈকট্যপ্রাপ্ত কোনো ফেরেশতা, প্রেরিত কোনো নবী, কোনো ওলি, কবর, ফেরেশতা কিংবা জিনের কাছে ইবাদতমূলক প্রার্থনা করা যাবে না।

একইভাবে ভরসা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আশা, সাহায্যের আবেদন, সহযোগিতা প্রার্থনা, আশ্রয় চাওয়া এবং মানত করার মতো ইবাদতও একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা যাবে না।

তিনি বলেন, এই কালিমাতুশ শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরম দয়ালু, সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহই এই দুই সাক্ষ্যবাণী বিধিবদ্ধ করেছেন এবং এগুলোর ওপর ইসলামের স্তম্ভ, ঈমান ও ইহসানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইসলামের সব বিধিবিধানের ভিত্তিও এই মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

মুখের ঈমানের সঙ্গে কাজের মিল রাখার আহ্বান

মুসলমানদের উদ্দেশে শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, তারা যখন একই কালিমা উচ্চারণের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন, তখন তাদের উচিত এর অর্থ ও দাবি অনুযায়ী কাজের ক্ষেত্রেও ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

তিনি বলেন, কালিমাতুশ শাহাদাতের শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আকিদা ও আদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করা।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের দুটি আয়াত উল্লেখ করেন। প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহর জীবনে মুমিনদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাঁর নবীর মহান চরিত্রের প্রশংসা করেছেন।

ইমাম মুসলমানদের আহ্বান জানান, তারা যেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাস ও জীবনাচরণে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহর সাহাবি এবং উত্তমভাবে তাঁদের অনুসরণকারী তাবেঈদের আদর্শ ধারণ করেন।

তিনি সাহাবিদের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সেই আয়াতও উদ্ধৃত করেন, যেখানে মুহাজির ও আনসারদের অগ্রগামী অংশ এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের অনুসরণকারীদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

ইসলামের আকিদা ও চার মাজহাবের ইমামদের অবস্থান

শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত আকিদা মানুষকে বিদআত থেকে রক্ষা করার পথ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই আকিদাই ইসলামের আকিদা এবং চার মাজহাবের ফকিহ ইমামরাও এই মৌলিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

তিনি বলেন, আল্লাহর সুন্দর নাম ও মহান গুণাবলিগুলোকে স্বীকার করতে হবে। তাঁর সত্তাগত ও কর্মগত গুণাবলির বাস্তবতা স্বীকার করার পাশাপাশি এসব গুণের প্রকৃত ধরন বা পদ্ধতি মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে বলে মেনে নিতে হবে। মানুষের বিবেক ও বুদ্ধি আল্লাহর গুণাবলির প্রকৃত স্বরূপ পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও পারস্পরিক সংহতির ওপর গুরুত্বারোপ

খুতবায় ইমাম আল-হুযাইফি মুসলমানদের ভাষা, ইতিহাস ও কিবলার অভিন্নতার কথাও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, মুসলমানরা সেই আরবি ভাষায় আল্লাহর ইবাদত করেন, যে ভাষায় তাঁরা নামাজে কোরআন তিলাওয়াত করেন। আল্লাহ পৃথিবীতে নবুয়তের ধারার সূচনা করার পর থেকে মুসলমানদের একটি অভিন্ন ধর্মীয় ইতিহাস রয়েছে। একইভাবে তাঁরা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কাবাকে কিবলা হিসেবে গ্রহণ করে একই দিকে মুখ করে ইবাদত করেন।

তিনি বলেন, এই অভিন্নতার ভিত্তিতে মুসলমানদের উচিত শক্তি, ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করা এবং বিভেদ ও মতবিরোধ পরিহার করা।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করেন:

“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মাহ এক উম্মাহ এবং আমিই তোমাদের রব। অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত করো।” (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৯২-এর ভাবার্থ)

সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা ও সহমর্মিতা জরুরি

শায়খ আল-হুযাইফি বলেন, ইসলামের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোনো বিপদ, দুর্যোগ কিংবা কঠিন পরিস্থিতি দেখা দিলে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, একে অন্যকে সমর্থন এবং দয়া-মমতা ছাড়া তা দূর করা বা সমাধান করা কঠিন।

তিনি বলেন, ইসলামের বিধিবিধান মানবজাতির জন্য কল্যাণকর। তবে যাদের উদ্দেশ্য অসৎ, তারা এসব বিধান ও কল্যাণকর উদ্যোগকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে পারে। তারা বিভিন্ন উপায়ে অপপ্রচার, সন্দেহ সৃষ্টি এবং মানুষের মধ্যে বাধা তৈরি করে ভালো উদ্যোগগুলোকে ব্যাহত করার চেষ্টা করে।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের দুটি আয়াত উল্লেখ করেন। একটি আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পরাক্রমশালী, যদিও অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। অন্য আয়াতে মুসলমানদের সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে এবং বিভক্ত না হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় মুসলমানরা পরস্পরের শত্রু ছিল। পরে আল্লাহ তাদের অন্তরে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেন এবং তাঁর অনুগ্রহে তারা ভাইয়ে ভাইয়ে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে এই ঐক্যকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যের সহযোগী হওয়ার আহ্বান

জুমার খুতবায় শায়খ আলী আল-হুযাইফি মুসলমানদের মধ্যে দয়া, সহযোগিতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করা মুমিন নারী ও পুরুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তিনি পবিত্র কোরআনের সেই আয়াত উদ্ধৃত করেন, যেখানে বলা হয়েছে, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অন্যের সহযোগী ও অভিভাবক। তাঁরা সৎকাজের নির্দেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, নামাজ প্রতিষ্ঠা করেন, জাকাত দেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করেন।

আয়াতটিতে আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন। তিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ মুমিন নারী ও পুরুষকে এমন জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং পবিত্র আবাসে বসবাস করবে। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, আর সেটিই মহাসাফল্য।

খুতবায় ইমাম আল-হুযাইফির মূল বক্তব্য ছিল, মুসলমানদের ঈমানের অভিন্ন ঘোষণা যেন বাস্তব জীবনে ঐক্য, সহমর্মিতা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। বিভেদ পরিহার করে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণের মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মাহর সংহতি আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ