হিমাচল প্রদেশের শিমলায় জেলা প্রশাসন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে ঐতিহাসিক সানজাউলি মসজিদে মুসলিমদের ইবাদত বন্ধ এবং মসজিদটি ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে। গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) প্রশাসন লিখিতভাবে প্রতিবাদকারী গোষ্ঠীগুলোর মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পর তারা তাদের বৃহত্তর আন্দোলন স্থগিত করে একে 'সনাতনী সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক বিজয়' বলে ঘোষণা করেছে। তবে বিদ্যুৎ ও পানির মতো অত্যাবশ্যক পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং মসজিদ ভাঙার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার মতো সিদ্ধান্তগুলি গুরুতর সাংবিধানিক ও আইনি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গত কয়েকদিন ধরে শিমলায় হিন্দু সংগঠনগুলোর লাগাতার বিক্ষোভ চলছিল, যার মূল দাবি ছিল ঐতিহাসিক সানজাউলি মসজিদটি ভেঙে ফেলা এবং সেখানে মুসলিমদের নামাজ পড়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। পরিস্থিতি চরম আকার নেয় গত শুক্রবার, যখন একটি হিন্দু সংগঠনের মহিলারা মসজিদে মুসলিমদের জুম্মার নামাজ পড়ায় বাধা দেন। এই ঘটনার ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
প্রতিবাদকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক হিসেবে দেখা হলেও, প্রশাসন গত শুক্রবার দেবভূমি সংঘর্ষ সমিতি-সহ অন্যান্য হিন্দু সংগঠনের মূল দাবিগুলো লিখিতভাবে মেনে নেয় বলে জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে:
মসজিদের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করা।
গত সপ্তাহের সহিংসতায় জড়িত হিন্দু সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর প্রত্যাহার করে নেওয়া।
মসজিদটি ভেঙে ফেলার জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা।
দেবভূমি সংঘর্ষ সমিতি এবং জেলা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি আট সদস্যের কমিটি গঠন করা।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পরই বিক্ষোভকারী গোষ্ঠীগুলো তাদের বৃহত্তর আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে এবং এটিকে তাদের আন্দোলনের "ঐতিহাসিক বিজয়" বলে অভিহিত করে বিজয় মিছিল করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশাসনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, অত্যাবশ্যক পরিষেবা (যেমন বিদ্যুৎ ও পানি) বিচ্ছিন্ন করা, চাপের মুখে পুলিশের মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং একটি উপাসনালয় ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করা—এই তিনটি দাবিই ভারতীয় সংবিধান এবং আইনের শাসনের গুরুতর লঙ্ঘন। এই সিদ্ধান্তগুলো দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)-এর নেতা কমল গৌতম নিশ্চিত করেছেন যে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে দেখা করে "সব দাবি মেনে নিয়েছেন" এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর প্রত্যাহার এবং ভাঙার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।
হিন্দু সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গত ৩০ অক্টোবরের শিমলা আদালতের একটি নির্দেশ প্রশাসন কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই নির্দেশে নাকি কর্তৃপক্ষকে মসজিদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাঠামোটি সিল করে দিতে বলা হয়েছিল। এই নির্দেশ কার্যকর না হওয়ার অভিযোগে চার দিন আগে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ বাড়লে পুলিশ সহিংসতা ও বাধা সৃষ্টির অভিযোগে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছিল, যা এখন প্রত্যাহারের পথে।
নাগরিক সমাজ, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ এবং সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো প্রশাসনের এই নতিস্বীকারকে অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির হিসেবে দেখছে। তারা মনে করছেন, জনরোষের কাছে মাথা নত করা আইনের শাসনকে ক্ষুণ্ণ করে এবং পাহাড়ি এই রাজ্যের ভঙ্গুর সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে। এই বিতর্কের বিষয়ে হিমাচল প্রদেশ সরকার এখনও কোনো সরকারি বিবৃতি জারি করেনি। হিন্দু সংগঠনগুলো আগামী ২৯ নভেম্বর একটি পর্যালোচনা বৈঠক ডেকেছে এবং প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি পালনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়েছে।
বিষয় : ভারত ইসলামফোবিয়া

সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রকাশের তারিখ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫
হিমাচল প্রদেশের শিমলায় জেলা প্রশাসন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে ঐতিহাসিক সানজাউলি মসজিদে মুসলিমদের ইবাদত বন্ধ এবং মসজিদটি ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে। গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) প্রশাসন লিখিতভাবে প্রতিবাদকারী গোষ্ঠীগুলোর মূল দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পর তারা তাদের বৃহত্তর আন্দোলন স্থগিত করে একে 'সনাতনী সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক বিজয়' বলে ঘোষণা করেছে। তবে বিদ্যুৎ ও পানির মতো অত্যাবশ্যক পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং মসজিদ ভাঙার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার মতো সিদ্ধান্তগুলি গুরুতর সাংবিধানিক ও আইনি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গত কয়েকদিন ধরে শিমলায় হিন্দু সংগঠনগুলোর লাগাতার বিক্ষোভ চলছিল, যার মূল দাবি ছিল ঐতিহাসিক সানজাউলি মসজিদটি ভেঙে ফেলা এবং সেখানে মুসলিমদের নামাজ পড়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। পরিস্থিতি চরম আকার নেয় গত শুক্রবার, যখন একটি হিন্দু সংগঠনের মহিলারা মসজিদে মুসলিমদের জুম্মার নামাজ পড়ায় বাধা দেন। এই ঘটনার ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
প্রতিবাদকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক হিসেবে দেখা হলেও, প্রশাসন গত শুক্রবার দেবভূমি সংঘর্ষ সমিতি-সহ অন্যান্য হিন্দু সংগঠনের মূল দাবিগুলো লিখিতভাবে মেনে নেয় বলে জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে:
মসজিদের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করা।
গত সপ্তাহের সহিংসতায় জড়িত হিন্দু সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর প্রত্যাহার করে নেওয়া।
মসজিদটি ভেঙে ফেলার জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা।
দেবভূমি সংঘর্ষ সমিতি এবং জেলা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি আট সদস্যের কমিটি গঠন করা।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পরই বিক্ষোভকারী গোষ্ঠীগুলো তাদের বৃহত্তর আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে এবং এটিকে তাদের আন্দোলনের "ঐতিহাসিক বিজয়" বলে অভিহিত করে বিজয় মিছিল করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশাসনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, অত্যাবশ্যক পরিষেবা (যেমন বিদ্যুৎ ও পানি) বিচ্ছিন্ন করা, চাপের মুখে পুলিশের মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং একটি উপাসনালয় ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করা—এই তিনটি দাবিই ভারতীয় সংবিধান এবং আইনের শাসনের গুরুতর লঙ্ঘন। এই সিদ্ধান্তগুলো দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)-এর নেতা কমল গৌতম নিশ্চিত করেছেন যে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে দেখা করে "সব দাবি মেনে নিয়েছেন" এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর প্রত্যাহার এবং ভাঙার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।
হিন্দু সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গত ৩০ অক্টোবরের শিমলা আদালতের একটি নির্দেশ প্রশাসন কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই নির্দেশে নাকি কর্তৃপক্ষকে মসজিদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাঠামোটি সিল করে দিতে বলা হয়েছিল। এই নির্দেশ কার্যকর না হওয়ার অভিযোগে চার দিন আগে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ বাড়লে পুলিশ সহিংসতা ও বাধা সৃষ্টির অভিযোগে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছিল, যা এখন প্রত্যাহারের পথে।
নাগরিক সমাজ, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ এবং সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো প্রশাসনের এই নতিস্বীকারকে অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির হিসেবে দেখছে। তারা মনে করছেন, জনরোষের কাছে মাথা নত করা আইনের শাসনকে ক্ষুণ্ণ করে এবং পাহাড়ি এই রাজ্যের ভঙ্গুর সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে। এই বিতর্কের বিষয়ে হিমাচল প্রদেশ সরকার এখনও কোনো সরকারি বিবৃতি জারি করেনি। হিন্দু সংগঠনগুলো আগামী ২৯ নভেম্বর একটি পর্যালোচনা বৈঠক ডেকেছে এবং প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি পালনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন