ঢাকা    সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
ঢাকা    সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
কওমী টাইমস

প্রশ্ন—এটি কি ইতিহাস সংশোধন, নাকি পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা?

উত্তর প্রদেশে আরও ১২টি মুসলিম ঐতিহ্যবাহী শহরের নাম বদলানোর উদ্যোগ


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তর প্রদেশে আরও ১২টি মুসলিম ঐতিহ্যবাহী শহরের নাম বদলানোর উদ্যোগ

উত্তর প্রদেশে গুরুত্বপূর্ণ শহর, এলাকা ও প্রশাসনিক শব্দের নাম পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, ক্ষমতাসীন যোগী আদিত্যনাথের সরকার পরিকল্পিতভাবে মুসলিম ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে দিতে চায়। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো আড়াল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ।

২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যের নাম পরিবর্তনের রাজনীতি অন্যতম বিতর্কিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনা—কুশীনগরের ফাজিলনগর পঞ্চায়েতের নাম পরিবর্তন করে ‘পাবা নগরী’ করার উদ্যোগ। এর মাধ্যমে পুনরায় প্রশ্ন উঠেছে পরিচয়, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে।

সরকারের যুক্তি, মুঘল আমলে আরোপিত অনেক নাম নাকি এই অঞ্চলের “আসল সাংস্কৃতিক পরিচয়” বহন করে না। তাই প্রাচীন হিন্দু সভ্যতার নাম ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

কিন্তু ইতিহাসবিদ ও বিরোধী দলের প্রশ্ন—কেন প্রায় সব নাম পরিবর্তনই মুসলিম শাসক, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বা ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত?

গত সাত বছরে ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি নাম পরিবর্তন করা হয়েছে—

ফয়জাবাদ → অযোধ্যা

আল্লাহাবাদ → প্রয়াগরাজ

মুঘলসরায় → পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় নগর

সমালোচকদের মতে, এটি ইতিহাস সংশোধন নয়—বরং ইতিহাসের একপাক্ষিক রূপ তৈরি করা। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সীমা আজাদ বলেন,

“নাম শুধু বোর্ড পাল্টায় না, স্মৃতি পাল্টায়। পুরনো নাম মুছে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবেই না তারা ছিল।”

উর্দু ও ফারসি শব্দ মুছে প্রশাসনিক ভাষা সংস্কৃতকরণের অভিযোজনকেও অনেকেই সাংস্কৃতিক বর্জন বলে মনে করছেন। অধ্যাপক তারিক হুসাইন বলেন,

“উর্দু তো ভারতেই জন্ম নিয়েছে। তাকে বিদেশি ভাবা ইতিহাসভুল।”

কাশিতে স্থানীয়দের অভিযোগ—৫০টির বেশি মুসলিম পরিচিতি বহনকারী এলাকার নাম বিনা আলোচনায় বদলে দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক তরুণ মনে করছেন, তাদের ইতিহাসের অধ্যায়গুলো মুছে যাচ্ছে।

এদিকে মুসলিমদের বাড়িতে বুলডোজার অভিযান—অনেক সময় অভিযোগহীনভাবেই—তাদের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়েছে। মোরাদাবাদের মোহাম্মদ সালমান বলেন,

“বুলডোজার শুধু যন্ত্র নয়, আমাদের কাছে এটি সতর্কবার্তা।”

বিরোধীরা বলছে—এটি প্রকৃত সমস্যা যেমন বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, অপরাধ ও অবকাঠামোগত দুরবস্থাকে আড়াল করার প্রচেষ্টা। কংগ্রেস এমপি ইমরান মাসুদ মন্তব্য করেন,

“বর্তমান সামলাতে না পেরে অতীতের সঙ্গে লড়াই করছে সরকার।”

তথ্যমতে, এবার যে ১২টি বড় শহরের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে—

আলিগড়, সাম্ভল, শাহজাহানপুর, মুজাফফরনগর ও ফৈজাবাদসহ বহু শহর—যেগুলো সুফি ঐতিহ্য, মুসলিম শিল্পী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিবাহী।

বিশ্লেষকদের সতর্কতা—এই ধারাবাহিকতায় উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক মানচিত্র এক প্রজন্মের মধ্যেই পাল্টে যাবে।

“ইতিহাস মুছে যাবে না, তবে তার সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে,” বলেন বিশ্লেষক অভিষেক আনন্দ।

ফরুখাবাদের সবজি বিক্রেতা শব্বির খানের কণ্ঠে মুসলিম জনমতের উদ্বেগ—

“প্রতিটি নতুন নাম আমাদের অস্তিত্বের একটি পাতা উল্টে দেয়। একদিন যদি পুরো বইটাই শেষ হয়ে যায়?”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানই ভারতীয় সভ্যতার শক্তি। তা দুর্বল হলে সমাজও বিপদে পড়বে।

“নাম হলো নোঙর,” বলেন গবেষক ড. হরজোত সিংহ।

“নোঙর তুললে সমাজ ভেসে যায়।”

বর্তমানে বিতর্ক আরও উত্তপ্ত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি তার বহুস্তরীয় ইতিহাস ছেঁটে কেবল একটি পরিচয়ের দিকে যাচ্ছ? নাকি এই প্রচেষ্টা সামাজিক সম্প্রীতির ভাঙন ডেকে আনবে?

বিষয় : ভারত ইসলামফোবিয়া

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫


উত্তর প্রদেশে আরও ১২টি মুসলিম ঐতিহ্যবাহী শহরের নাম বদলানোর উদ্যোগ

প্রকাশের তারিখ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫

featured Image

উত্তর প্রদেশে গুরুত্বপূর্ণ শহর, এলাকা ও প্রশাসনিক শব্দের নাম পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, ক্ষমতাসীন যোগী আদিত্যনাথের সরকার পরিকল্পিতভাবে মুসলিম ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে দিতে চায়। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো আড়াল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ।

২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যের নাম পরিবর্তনের রাজনীতি অন্যতম বিতর্কিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনা—কুশীনগরের ফাজিলনগর পঞ্চায়েতের নাম পরিবর্তন করে ‘পাবা নগরী’ করার উদ্যোগ। এর মাধ্যমে পুনরায় প্রশ্ন উঠেছে পরিচয়, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে।

সরকারের যুক্তি, মুঘল আমলে আরোপিত অনেক নাম নাকি এই অঞ্চলের “আসল সাংস্কৃতিক পরিচয়” বহন করে না। তাই প্রাচীন হিন্দু সভ্যতার নাম ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

কিন্তু ইতিহাসবিদ ও বিরোধী দলের প্রশ্ন—কেন প্রায় সব নাম পরিবর্তনই মুসলিম শাসক, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বা ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত?

গত সাত বছরে ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি নাম পরিবর্তন করা হয়েছে—

ফয়জাবাদ → অযোধ্যা

আল্লাহাবাদ → প্রয়াগরাজ

মুঘলসরায় → পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায় নগর

সমালোচকদের মতে, এটি ইতিহাস সংশোধন নয়—বরং ইতিহাসের একপাক্ষিক রূপ তৈরি করা। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সীমা আজাদ বলেন,

“নাম শুধু বোর্ড পাল্টায় না, স্মৃতি পাল্টায়। পুরনো নাম মুছে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবেই না তারা ছিল।”

উর্দু ও ফারসি শব্দ মুছে প্রশাসনিক ভাষা সংস্কৃতকরণের অভিযোজনকেও অনেকেই সাংস্কৃতিক বর্জন বলে মনে করছেন। অধ্যাপক তারিক হুসাইন বলেন,

“উর্দু তো ভারতেই জন্ম নিয়েছে। তাকে বিদেশি ভাবা ইতিহাসভুল।”

কাশিতে স্থানীয়দের অভিযোগ—৫০টির বেশি মুসলিম পরিচিতি বহনকারী এলাকার নাম বিনা আলোচনায় বদলে দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক তরুণ মনে করছেন, তাদের ইতিহাসের অধ্যায়গুলো মুছে যাচ্ছে।

এদিকে মুসলিমদের বাড়িতে বুলডোজার অভিযান—অনেক সময় অভিযোগহীনভাবেই—তাদের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়েছে। মোরাদাবাদের মোহাম্মদ সালমান বলেন,

“বুলডোজার শুধু যন্ত্র নয়, আমাদের কাছে এটি সতর্কবার্তা।”

বিরোধীরা বলছে—এটি প্রকৃত সমস্যা যেমন বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, অপরাধ ও অবকাঠামোগত দুরবস্থাকে আড়াল করার প্রচেষ্টা। কংগ্রেস এমপি ইমরান মাসুদ মন্তব্য করেন,

“বর্তমান সামলাতে না পেরে অতীতের সঙ্গে লড়াই করছে সরকার।”

তথ্যমতে, এবার যে ১২টি বড় শহরের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে—

আলিগড়, সাম্ভল, শাহজাহানপুর, মুজাফফরনগর ও ফৈজাবাদসহ বহু শহর—যেগুলো সুফি ঐতিহ্য, মুসলিম শিল্পী ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিবাহী।

বিশ্লেষকদের সতর্কতা—এই ধারাবাহিকতায় উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক মানচিত্র এক প্রজন্মের মধ্যেই পাল্টে যাবে।

“ইতিহাস মুছে যাবে না, তবে তার সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে,” বলেন বিশ্লেষক অভিষেক আনন্দ।

ফরুখাবাদের সবজি বিক্রেতা শব্বির খানের কণ্ঠে মুসলিম জনমতের উদ্বেগ—

“প্রতিটি নতুন নাম আমাদের অস্তিত্বের একটি পাতা উল্টে দেয়। একদিন যদি পুরো বইটাই শেষ হয়ে যায়?”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানই ভারতীয় সভ্যতার শক্তি। তা দুর্বল হলে সমাজও বিপদে পড়বে।

“নাম হলো নোঙর,” বলেন গবেষক ড. হরজোত সিংহ।

“নোঙর তুললে সমাজ ভেসে যায়।”

বর্তমানে বিতর্ক আরও উত্তপ্ত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি তার বহুস্তরীয় ইতিহাস ছেঁটে কেবল একটি পরিচয়ের দিকে যাচ্ছ? নাকি এই প্রচেষ্টা সামাজিক সম্প্রীতির ভাঙন ডেকে আনবে?


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মুস্তাইন বিল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৫ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত