ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও ঘৃণার রাজনীতি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, ঠিক সেই সময় পাঞ্জাবের মালারকোটলার উমরপুরা গ্রাম তুলে ধরল সম্প্রীতি ও মানবতার এক অনন্য নজির। শিখ সম্প্রদায়ের দান করা জমিতে নির্মিত ‘মদিনা মসজিদ’-এর উদ্বোধন মুসলিমদের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে সম্মান, স্বস্তি ও ঐক্যের আশ্বাস।
পাঞ্জাবের মালারকোটলা জেলার উমরপুরা গ্রামে শিখ সম্প্রদায়ের দানকৃত জমিতে নির্মিত ‘মদিনা মসজিদ’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে রোববার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫। দীর্ঘদিন ধরে একটি মসজিদের জন্য অপেক্ষায় থাকা গ্রামের মুসলিম বাসিন্দাদের জন্য এটি ছিল আবেগ, আনন্দ ও স্বস্তির দিন।
উদ্বোধনী নামাজে ইমামতি করেন পাঞ্জাবের শাহী ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ উসমান লুধিয়ানভি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জমিদাতা ও সাবেক সরপঞ্চ সুখ জনদর সিং, স্থানীয় শিখ পরিবার, মুসলিম আলেম ও গ্রামবাসীরা।
দীর্ঘদিন ধরে উমরপুরা গ্রামে কোনো মসজিদ ছিল না। ফলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিদের যেতে হতো পাশের গ্রামে। এতে বিশেষ করে বয়স্ক মুসলিমদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো। নতুন এই মসজিদ তাদের সেই কষ্টের অবসান ঘটিয়েছে।
মসজিদের ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ মুসল্লি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“আমরা এত বছর অপেক্ষা করেছি। আজ আমাদের স্বপ্ন পূরণ হলো।”
এই মহানুভব উদ্যোগের সূচনা হয় যখন শিখ পরিবারগুলো নিজেদের মুসলিম প্রতিবেশীদের কষ্ট উপলব্ধি করেন। তারা ছয় একর জমি ও ৫ লাখ রুপি অনুদান দেন মসজিদ নির্মাণের জন্য।
শাহী ইমাম লুধিয়ানভি স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“এখানে অনেক মুসলিম পরিবার থাকলেও কোনো মসজিদ ছিল না। মুসলমানদের অন্য গ্রামে গিয়ে নামাজ পড়তে হতো। শিখ ভাইয়েরাই এই কষ্ট বুঝে এগিয়ে এসে জমি ও সাহায্য দিয়েছেন।”
১২ জানুয়ারি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এর আগেই ১৫ জানুয়ারি ‘ক্ল্যারিয়ন ইন্ডিয়া’ এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্বারী ফুরকান হক্কানি, ক্বারী ইরফান, ক্বারী রশিদ (পাঠানপুরা), ক্বারী মুহাম্মদ সালমান, ক্বারী মুহাম্মদ ইয়াকুব এবং ক্বারী মুহাম্মদ সাদিক ইয়াজদানি। নির্মাণ তত্ত্বাবধায়ক ও জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দের স্থানীয় প্রতিনিধি ক্বারী ফুরকান আহমদও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
মসজিদের আঙিনায় শিখ ও মুসলমানদের একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যটি ছিল বর্তমান ভারতের বাস্তবতায় এক বিরল ও স্পর্শকাতর মুহূর্ত।
আসর নামাজের মধ্য দিয়ে যখন প্রথম জামাত শুরু হয়, তখন পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ আবেগ ও কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে।
শাহী ইমাম তাঁর বক্তব্যে বলেন,
“দেশের দিকে তাকান—ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, মানুষকে বিভক্ত করা হচ্ছে। অথচ পাঞ্জাবে মানুষ ভালোবাসা, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের এক নতুন ইতিহাস লিখছে।”
তিনি আরও বলেন,
“যখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানরা কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর চাপে রয়েছে, তখন শিখ সম্প্রদায় যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তা অত্যন্ত সম্মানের।”
জমিদাতা সুখ জনদর সিং আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বলেন,
“আমার বাড়ি মসজিদের পাশেই। আমি শান্তি পাবো যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান শুনবো।”
তিনি বলেন,
“উমরপুরার মুসলমানরা সবসময় মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করেছে। তাদের একটি নিকটবর্তী মসজিদ প্রাপ্য ছিল।”
গ্রামের তরুণ প্রজন্ম জানায়, এই মসজিদ তাদের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে; যখন সারা দেশে মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ছে, তখন এই ঘটনা প্রমাণ করে মানবতা এখনও বেঁচে আছে।
একজন যুবক বলেন,
“এত ঘৃণার মাঝেও এই মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দিল—ভালো মানুষ এখনো আছে।”
যখন দেশের অন্যান্য অংশে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, হুমকি ও প্রকাশ্য ঘৃণা বাড়ছে, তখন মালারকোটলার মানুষ গর্বের সঙ্গে বলছে—পাঞ্জাব আবারও শান্তির পথ দেখাল।
উমরপুরায় প্রথমবারের মতো আজান ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মুসলমান জানান, তাদের বুকের ভার যেন হালকা হয়ে এসেছে।
‘মদিনা মসজিদ’ এখন শুধু নামাজের স্থান নয়—এটি হয়ে উঠেছে ঐক্য, মানবতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার প্রতীক, যা আজকের ভারতের সবচেয়ে প্রয়োজন।

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও ঘৃণার রাজনীতি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, ঠিক সেই সময় পাঞ্জাবের মালারকোটলার উমরপুরা গ্রাম তুলে ধরল সম্প্রীতি ও মানবতার এক অনন্য নজির। শিখ সম্প্রদায়ের দান করা জমিতে নির্মিত ‘মদিনা মসজিদ’-এর উদ্বোধন মুসলিমদের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে সম্মান, স্বস্তি ও ঐক্যের আশ্বাস।
পাঞ্জাবের মালারকোটলা জেলার উমরপুরা গ্রামে শিখ সম্প্রদায়ের দানকৃত জমিতে নির্মিত ‘মদিনা মসজিদ’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে রোববার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫। দীর্ঘদিন ধরে একটি মসজিদের জন্য অপেক্ষায় থাকা গ্রামের মুসলিম বাসিন্দাদের জন্য এটি ছিল আবেগ, আনন্দ ও স্বস্তির দিন।
উদ্বোধনী নামাজে ইমামতি করেন পাঞ্জাবের শাহী ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ উসমান লুধিয়ানভি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জমিদাতা ও সাবেক সরপঞ্চ সুখ জনদর সিং, স্থানীয় শিখ পরিবার, মুসলিম আলেম ও গ্রামবাসীরা।
দীর্ঘদিন ধরে উমরপুরা গ্রামে কোনো মসজিদ ছিল না। ফলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিদের যেতে হতো পাশের গ্রামে। এতে বিশেষ করে বয়স্ক মুসলিমদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো। নতুন এই মসজিদ তাদের সেই কষ্টের অবসান ঘটিয়েছে।
মসজিদের ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ মুসল্লি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“আমরা এত বছর অপেক্ষা করেছি। আজ আমাদের স্বপ্ন পূরণ হলো।”
এই মহানুভব উদ্যোগের সূচনা হয় যখন শিখ পরিবারগুলো নিজেদের মুসলিম প্রতিবেশীদের কষ্ট উপলব্ধি করেন। তারা ছয় একর জমি ও ৫ লাখ রুপি অনুদান দেন মসজিদ নির্মাণের জন্য।
শাহী ইমাম লুধিয়ানভি স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“এখানে অনেক মুসলিম পরিবার থাকলেও কোনো মসজিদ ছিল না। মুসলমানদের অন্য গ্রামে গিয়ে নামাজ পড়তে হতো। শিখ ভাইয়েরাই এই কষ্ট বুঝে এগিয়ে এসে জমি ও সাহায্য দিয়েছেন।”
১২ জানুয়ারি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এর আগেই ১৫ জানুয়ারি ‘ক্ল্যারিয়ন ইন্ডিয়া’ এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্বারী ফুরকান হক্কানি, ক্বারী ইরফান, ক্বারী রশিদ (পাঠানপুরা), ক্বারী মুহাম্মদ সালমান, ক্বারী মুহাম্মদ ইয়াকুব এবং ক্বারী মুহাম্মদ সাদিক ইয়াজদানি। নির্মাণ তত্ত্বাবধায়ক ও জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দের স্থানীয় প্রতিনিধি ক্বারী ফুরকান আহমদও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
মসজিদের আঙিনায় শিখ ও মুসলমানদের একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যটি ছিল বর্তমান ভারতের বাস্তবতায় এক বিরল ও স্পর্শকাতর মুহূর্ত।
আসর নামাজের মধ্য দিয়ে যখন প্রথম জামাত শুরু হয়, তখন পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ আবেগ ও কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে।
শাহী ইমাম তাঁর বক্তব্যে বলেন,
“দেশের দিকে তাকান—ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, মানুষকে বিভক্ত করা হচ্ছে। অথচ পাঞ্জাবে মানুষ ভালোবাসা, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের এক নতুন ইতিহাস লিখছে।”
তিনি আরও বলেন,
“যখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানরা কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর চাপে রয়েছে, তখন শিখ সম্প্রদায় যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তা অত্যন্ত সম্মানের।”
জমিদাতা সুখ জনদর সিং আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বলেন,
“আমার বাড়ি মসজিদের পাশেই। আমি শান্তি পাবো যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান শুনবো।”
তিনি বলেন,
“উমরপুরার মুসলমানরা সবসময় মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করেছে। তাদের একটি নিকটবর্তী মসজিদ প্রাপ্য ছিল।”
গ্রামের তরুণ প্রজন্ম জানায়, এই মসজিদ তাদের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে; যখন সারা দেশে মুসলিমবিদ্বেষ বাড়ছে, তখন এই ঘটনা প্রমাণ করে মানবতা এখনও বেঁচে আছে।
একজন যুবক বলেন,
“এত ঘৃণার মাঝেও এই মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দিল—ভালো মানুষ এখনো আছে।”
যখন দেশের অন্যান্য অংশে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, হুমকি ও প্রকাশ্য ঘৃণা বাড়ছে, তখন মালারকোটলার মানুষ গর্বের সঙ্গে বলছে—পাঞ্জাব আবারও শান্তির পথ দেখাল।
উমরপুরায় প্রথমবারের মতো আজান ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মুসলমান জানান, তাদের বুকের ভার যেন হালকা হয়ে এসেছে।
‘মদিনা মসজিদ’ এখন শুধু নামাজের স্থান নয়—এটি হয়ে উঠেছে ঐক্য, মানবতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার প্রতীক, যা আজকের ভারতের সবচেয়ে প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন