ভারতের প্রায় ১৫ লাখ পাড়া বা মহল্লা নিয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির মুসলিম এবং তফসিলি জাতিভুক্ত (এসসি) মানুষ অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন এবং সেবাবঞ্চিত এলাকায় বসবাস করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চ (NBER)-এর এই গবেষণায় দেখা গেছে, এসব জনপদে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সুপেয় পানির মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো পরিকল্পিতভাবে কম সরবরাহ করা হয়েছে।
ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত এই বৃহৎ গবেষণায় ৪০০,০০০ শহুরে এবং ১.১ মিলিয়ন গ্রামীণ এলাকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষক স্যাম অ্যাশার, কৃতার্থ ঝা এবং পাল নোভোসাডসহ একদল বিশেষজ্ঞ দেখিয়েছেন যে, ভারতে মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের আবাসন ব্যবস্থার বিভাজন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও অত্যন্ত প্রকট।
গবেষণার তথ্যমতে, ভারতের ২৬ শতাংশ মুসলিম এমন এলাকায় বাস করেন যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৮০ শতাংশের বেশি। একইভাবে ১৬ শতাংশ তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষ উচ্চমাত্রার বিচ্ছিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। এই আবাসিক বিচ্ছিন্নতার মাত্রা যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যকার ঐতিহাসিক বিভাজনের প্রায় কাছাকাছি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরগুলোতেও এই বিভাজন গ্রামীণ প্রাচীন প্রথার মতোই বিদ্যমান।
গবেষণাটি কেবল বসবাসের বিচ্ছিন্নতাই নয়, বরং সরকারি সুযোগ-সুবিধার চরম অসম বণ্টন উন্মোচন করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী:
শিক্ষা: ১০০% মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকার সম্ভাবনা একটি অ-মুসলিম এলাকার তুলনায় মাত্র অর্ধেক।
পানি ও স্যানিটেশন: মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে পাইপলাইনের পানি পাওয়ার সম্ভাবনা ১০% কম।
বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশন: তফসিলি জাতি অধ্যুষিত এলাকায় বিদ্যুৎ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবকাঠামো অত্যন্ত নাজুক।
গবেষকদের মতে, বেসরকারি সংস্থাগুলোও এসব পিছিয়ে পড়া এলাকায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগ্রহী হয় না, ফলে বঞ্চনা আরও ঘনীভূত হয়।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় চমক হলো, সরকারি জেলা পর্যায়ের পরিসংখ্যানে এই বৈষম্য ধরা পড়ে না। জেলা পর্যায়ে অনেক সময় মনে হয় যে প্রান্তিক মানুষের জন্য বরাদ্দ বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় শহরের ভেতরে বা গ্রামের নির্দিষ্ট মহল্লা স্তরে সেই সুযোগগুলো পৌঁছায় না। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, নীতিনির্ধারকরা কেবল জেলাভিত্তিক তথ্য দেখলে আসল চিত্র বুঝতে পারবেন না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মুসলিমদের মধ্যে 'আপওয়ার্ড মোবিলিটি' বা প্রজন্মগত শিক্ষার উন্নতি ভারতে সবচেয়ে কম। যেসব শহরে অতীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, সেখানে এই আবাসিক বিভাজন ও বঞ্চনার হার অনেক বেশি। আসাম এবং কাশ্মীরের মতো এলাকায় এই ধরনের পদ্ধতিগত বঞ্চনা গণহত্যার প্রাথমিক লক্ষণের দিকে ধাবিত করতে পারে বলেও প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিষয় : ভারত

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভারতের প্রায় ১৫ লাখ পাড়া বা মহল্লা নিয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির মুসলিম এবং তফসিলি জাতিভুক্ত (এসসি) মানুষ অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন এবং সেবাবঞ্চিত এলাকায় বসবাস করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চ (NBER)-এর এই গবেষণায় দেখা গেছে, এসব জনপদে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সুপেয় পানির মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো পরিকল্পিতভাবে কম সরবরাহ করা হয়েছে।
ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত এই বৃহৎ গবেষণায় ৪০০,০০০ শহুরে এবং ১.১ মিলিয়ন গ্রামীণ এলাকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষক স্যাম অ্যাশার, কৃতার্থ ঝা এবং পাল নোভোসাডসহ একদল বিশেষজ্ঞ দেখিয়েছেন যে, ভারতে মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের আবাসন ব্যবস্থার বিভাজন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও অত্যন্ত প্রকট।
গবেষণার তথ্যমতে, ভারতের ২৬ শতাংশ মুসলিম এমন এলাকায় বাস করেন যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৮০ শতাংশের বেশি। একইভাবে ১৬ শতাংশ তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষ উচ্চমাত্রার বিচ্ছিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। এই আবাসিক বিচ্ছিন্নতার মাত্রা যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যকার ঐতিহাসিক বিভাজনের প্রায় কাছাকাছি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরগুলোতেও এই বিভাজন গ্রামীণ প্রাচীন প্রথার মতোই বিদ্যমান।
গবেষণাটি কেবল বসবাসের বিচ্ছিন্নতাই নয়, বরং সরকারি সুযোগ-সুবিধার চরম অসম বণ্টন উন্মোচন করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী:
শিক্ষা: ১০০% মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকার সম্ভাবনা একটি অ-মুসলিম এলাকার তুলনায় মাত্র অর্ধেক।
পানি ও স্যানিটেশন: মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে পাইপলাইনের পানি পাওয়ার সম্ভাবনা ১০% কম।
বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশন: তফসিলি জাতি অধ্যুষিত এলাকায় বিদ্যুৎ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবকাঠামো অত্যন্ত নাজুক।
গবেষকদের মতে, বেসরকারি সংস্থাগুলোও এসব পিছিয়ে পড়া এলাকায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগ্রহী হয় না, ফলে বঞ্চনা আরও ঘনীভূত হয়।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় চমক হলো, সরকারি জেলা পর্যায়ের পরিসংখ্যানে এই বৈষম্য ধরা পড়ে না। জেলা পর্যায়ে অনেক সময় মনে হয় যে প্রান্তিক মানুষের জন্য বরাদ্দ বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় শহরের ভেতরে বা গ্রামের নির্দিষ্ট মহল্লা স্তরে সেই সুযোগগুলো পৌঁছায় না। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, নীতিনির্ধারকরা কেবল জেলাভিত্তিক তথ্য দেখলে আসল চিত্র বুঝতে পারবেন না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মুসলিমদের মধ্যে 'আপওয়ার্ড মোবিলিটি' বা প্রজন্মগত শিক্ষার উন্নতি ভারতে সবচেয়ে কম। যেসব শহরে অতীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, সেখানে এই আবাসিক বিভাজন ও বঞ্চনার হার অনেক বেশি। আসাম এবং কাশ্মীরের মতো এলাকায় এই ধরনের পদ্ধতিগত বঞ্চনা গণহত্যার প্রাথমিক লক্ষণের দিকে ধাবিত করতে পারে বলেও প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন