শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

নাগরিক দুর্ভোগ নিরসনে গিয়ে হেনস্তার শিকার; হিন্দুরাষ্ট্রের দাবিতে সরব বিজেপি নেতারা

বিদ্যুৎ অফিসে নামাজের দায়ে মামলার শিকার ৭ মুসলিম


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যুৎ অফিসে নামাজের দায়ে মামলার শিকার ৭ মুসলিম

ভারতের মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও পৌর কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগে নামাজ আদায়ের অভিযোগে সাতজন মুসলিম ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে স্থানীয় পুলিশ। এলাকাভিত্তিক নাগরিক সমস্যা ও রাস্তার বাতি সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আলোচনার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের এই নামাজকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন, অন্যদিকে একে ‘পাবলিক নুইসেন্স’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আইনি ব্যবস্থার দাবি।

বিদ্যুৎ বিভাগের গুদাম রক্ষক ৪৩ বছর বয়সী মহেন্দ্র রঘুনাথ সাওয়ান্তের অভিযোগের ভিত্তিতে মহারাষ্ট্র পুলিশ এই মামলাটি রুজু করে। এফআইআর-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মালেগাঁও লোক সমিতির সভাপতি লুকমান এবং সালিম নামের দুই ব্যক্তি তাদের অনুসারীদের নিয়ে অফিসে প্রবেশ করেন। তারা স্ট্রিটলাইট এবং রেজিস্টার সংক্রান্ত তথ্য দাবি করেন।

সাবেক বিজেপি এমপি কিরিট সোমাইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ (সাবেক টুইটার) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে 'হিন্দু রাষ্ট্রে'র পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী নিতেশ রানে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মসজিদের বদলে সরকারি অফিসে নামাজ পড়া হলো। তারা মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের কাছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরখাস্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। নামাজ আদায়ের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলো এটিকে আইনি লঙ্ঘনের বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।

মূল ঘটনাটি ঘটে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টার দিকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মালেগাঁওয়ের নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্ডে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং রাস্তার বাতি না থাকার প্রতিবাদে ও সমাধানের লক্ষ্যে পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের বিকাল ৩টায় একটি সভায় ডেকেছিল। মালেগাঁও লোক সমিতির সভাপতি লুকমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল যথাসময়ে উপস্থিত হলেও কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়।

অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হওয়ায় এবং রমজান মাস চলায় আসরের নামাজের ওয়াক্ত পার হয়ে যাচ্ছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা যদি নামাজ পড়তে বাইরে যেতেন, তবে বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা সভা বাতিল করে দেওয়ার অজুহাত পেতেন। তাই তারা অফিস কক্ষের এক কোণে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে নামাজ আদায় করে নেন।

মহারাষ্ট্র পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এর ১৩২ (সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা), ২৯২ (জনবিরক্তি বা পাবলিক নুইসেন্স), ১৮৯ (বেআইনি সমাবেশ) এবং ১৯০ ধারায় মামলা দায়ের করেছে। সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, নাগরিক অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই নামাজের ইস্যুটিকে সামনে আনা হয়েছে।

আইনি ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটি নাগরিক সেবা বনাম ধর্মীয় আচরণের মধ্যকার একটি সূক্ষ্ম লড়াইকে সামনে এনেছে। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়, যতক্ষণ না তা জনশৃঙ্খলা বা নৈতিকতা বিঘ্নিত করে। এক্ষেত্রে একটি কক্ষের কোণায় শান্তভাবে নামাজ আদায় কীভাবে 'পাবলিক নুইসেন্স' বা 'সরকারি কাজে বাধা' হয়, তা নিয়ে আইনি মহলে বিতর্ক রয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, জনসেবামূলক অফিসে নাগরিকদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রাখা এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজনের (যেমন প্রার্থনা) সুযোগ না দেওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতার নামান্তর। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে "হিন্দু রাষ্ট্র" বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের বুলি আওড়িয়ে আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পাবলিক স্পেসে মুসলিমদের ধর্মীয় উপস্থিতি ক্রমাগত সংকুচিত করার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পুরো বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক চশমা দিয়ে না দেখে, নাগরিক হয়রানি এবং ধর্মীয় প্রয়োজনের বাস্তবতাকে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা। মালেগাঁওয়ের এই পরিস্থিতি কেবল একটি আইনি মামলা নয়, বরং এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক সুরক্ষা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার এক বড় পরীক্ষা।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


বিদ্যুৎ অফিসে নামাজের দায়ে মামলার শিকার ৭ মুসলিম

প্রকাশের তারিখ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

ভারতের মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও পৌর কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগে নামাজ আদায়ের অভিযোগে সাতজন মুসলিম ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে স্থানীয় পুলিশ। এলাকাভিত্তিক নাগরিক সমস্যা ও রাস্তার বাতি সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আলোচনার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের এই নামাজকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন, অন্যদিকে একে ‘পাবলিক নুইসেন্স’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আইনি ব্যবস্থার দাবি।

বিদ্যুৎ বিভাগের গুদাম রক্ষক ৪৩ বছর বয়সী মহেন্দ্র রঘুনাথ সাওয়ান্তের অভিযোগের ভিত্তিতে মহারাষ্ট্র পুলিশ এই মামলাটি রুজু করে। এফআইআর-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মালেগাঁও লোক সমিতির সভাপতি লুকমান এবং সালিম নামের দুই ব্যক্তি তাদের অনুসারীদের নিয়ে অফিসে প্রবেশ করেন। তারা স্ট্রিটলাইট এবং রেজিস্টার সংক্রান্ত তথ্য দাবি করেন।

সাবেক বিজেপি এমপি কিরিট সোমাইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ (সাবেক টুইটার) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে 'হিন্দু রাষ্ট্রে'র পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী নিতেশ রানে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মসজিদের বদলে সরকারি অফিসে নামাজ পড়া হলো। তারা মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের কাছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরখাস্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। নামাজ আদায়ের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলো এটিকে আইনি লঙ্ঘনের বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে।

মূল ঘটনাটি ঘটে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টার দিকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মালেগাঁওয়ের নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্ডে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং রাস্তার বাতি না থাকার প্রতিবাদে ও সমাধানের লক্ষ্যে পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের বিকাল ৩টায় একটি সভায় ডেকেছিল। মালেগাঁও লোক সমিতির সভাপতি লুকমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল যথাসময়ে উপস্থিত হলেও কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়।

অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হওয়ায় এবং রমজান মাস চলায় আসরের নামাজের ওয়াক্ত পার হয়ে যাচ্ছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা যদি নামাজ পড়তে বাইরে যেতেন, তবে বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা সভা বাতিল করে দেওয়ার অজুহাত পেতেন। তাই তারা অফিস কক্ষের এক কোণে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে নামাজ আদায় করে নেন।

মহারাষ্ট্র পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এর ১৩২ (সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা), ২৯২ (জনবিরক্তি বা পাবলিক নুইসেন্স), ১৮৯ (বেআইনি সমাবেশ) এবং ১৯০ ধারায় মামলা দায়ের করেছে। সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, নাগরিক অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই নামাজের ইস্যুটিকে সামনে আনা হয়েছে।

আইনি ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটি নাগরিক সেবা বনাম ধর্মীয় আচরণের মধ্যকার একটি সূক্ষ্ম লড়াইকে সামনে এনেছে। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়, যতক্ষণ না তা জনশৃঙ্খলা বা নৈতিকতা বিঘ্নিত করে। এক্ষেত্রে একটি কক্ষের কোণায় শান্তভাবে নামাজ আদায় কীভাবে 'পাবলিক নুইসেন্স' বা 'সরকারি কাজে বাধা' হয়, তা নিয়ে আইনি মহলে বিতর্ক রয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, জনসেবামূলক অফিসে নাগরিকদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রাখা এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজনের (যেমন প্রার্থনা) সুযোগ না দেওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতার নামান্তর। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে "হিন্দু রাষ্ট্র" বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের বুলি আওড়িয়ে আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পাবলিক স্পেসে মুসলিমদের ধর্মীয় উপস্থিতি ক্রমাগত সংকুচিত করার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পুরো বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক চশমা দিয়ে না দেখে, নাগরিক হয়রানি এবং ধর্মীয় প্রয়োজনের বাস্তবতাকে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা। মালেগাঁওয়ের এই পরিস্থিতি কেবল একটি আইনি মামলা নয়, বরং এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক সুরক্ষা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার এক বড় পরীক্ষা।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত