শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

গরু পালনকারী দরিদ্র কৃষককে ‘পশু ব্যবসায়ী’ অপবাদে অমানুষিক নির্যাতন

বাছুর ক্রয়ের অপরাধে মুসলিম কৃষককে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা: গো-রক্ষকদের তাণ্ডবে জনমনে আতঙ্ক



বাছুর ক্রয়ের অপরাধে মুসলিম কৃষককে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা: গো-রক্ষকদের তাণ্ডবে জনমনে আতঙ্ক

ভারতের বিহার রাজ্যের পশ্চিম চম্পারণ জেলার বেতিয়ায় এক মুসলিম কৃষককে গরু চোর ও ব্যবসায়ী অপবাদে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। নিজের পালনের জন্য কেনা একটি বাছুর নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ‘গো-রক্ষক’ নামধারী একদল উগ্রবাদী যুবক শেখ নানহে নামের ওই কৃষকের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালায়। এই ঘটনায় স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।

উদ্ধারকৃত তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দিষ্ট হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে শেখ নানহেকে পথরোধ করে। তাদের দাবি ছিল, নানহে কোনো সাধারণ কৃষক নন, বরং তিনি অবৈধ গবাদি পশু ব্যবসার সাথে জড়িত। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, বাছুরটি পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। হামলার সময় তারা শেখ নানহেকে জেরা করতে থাকে এবং তাদের দাবির সপক্ষে ভিডিও রেকর্ড করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। তবে এখন পর্যন্ত অভিযুক্তরা বাছুরটি যে অবৈধ ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল, তার কোনো দালিলিক প্রমাণ পুলিশের কাছে পেশ করতে পারেনি।

ঘটনাটি ২৮ ফেব্রুয়ারি বেতিয়ার নৌতন থানা এলাকার খাড্ডা কুজালহি গ্রামে ঘটে। ভুক্তভোগী শেখ নানহে জানান, তিনি স্থানীয় বাজার থেকে মাত্র ২,৮০০ রুপিতে একটি বাছুর কিনেছিলেন বাড়িতে লালন-পালন করার জন্য। বাড়ি ফেরার পথে একদল যুবক তাকে ঘিরে ধরে এবং মারধর শুরু করে।

ভুক্তভোগী শেখ নানহের ভাষ্য:

"আমি তাদের বারবার বলেছি যে আমি একজন দরিদ্র কৃষক, কসাই বা ব্যবসায়ী নই। বাছুরটি আমি পালার জন্য কিনেছি। আমি তাদের কাছে প্রাণের ভিক্ষা চেয়েছি, কিন্তু তারা শোনেনি। তারা আমাকে নির্মমভাবে পেটাতে থাকে এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে।"

হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ঘটনায় নৌতন থানায় শেখ নানহে দুইজনের নাম উল্লেখ করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "সাধারণ কেনাকাটার জন্য যদি এভাবে গণপিটুনির শিকার হতে হয়, তবে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?"

বিহারে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুসলিমদের ওপর এই ধরনের পরিকল্পিত হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

  • ডিসেম্বর ২০২৫: নওয়াদায় আতহার হোসেন নামের এক কাপড় ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
  • ২০২৫ (কিষাণগঞ্জ): সাব্বির আলম নামের এক ব্যক্তিকে চুরির অপবাদে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
  • জানুয়ারি ২০২৬: মধুবনীতে এক মুসলিম শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ অপবাদে মারধর করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, আইনের শাসনের অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এই ধরনের ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনির সাহস জোগাচ্ছে। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে শারীরিক নির্যাতন বা লাঞ্ছিত করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


বাছুর ক্রয়ের অপরাধে মুসলিম কৃষককে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা: গো-রক্ষকদের তাণ্ডবে জনমনে আতঙ্ক

প্রকাশের তারিখ : ০১ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতের বিহার রাজ্যের পশ্চিম চম্পারণ জেলার বেতিয়ায় এক মুসলিম কৃষককে গরু চোর ও ব্যবসায়ী অপবাদে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। নিজের পালনের জন্য কেনা একটি বাছুর নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ‘গো-রক্ষক’ নামধারী একদল উগ্রবাদী যুবক শেখ নানহে নামের ওই কৃষকের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালায়। এই ঘটনায় স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।

উদ্ধারকৃত তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দিষ্ট হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে শেখ নানহেকে পথরোধ করে। তাদের দাবি ছিল, নানহে কোনো সাধারণ কৃষক নন, বরং তিনি অবৈধ গবাদি পশু ব্যবসার সাথে জড়িত। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, বাছুরটি পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। হামলার সময় তারা শেখ নানহেকে জেরা করতে থাকে এবং তাদের দাবির সপক্ষে ভিডিও রেকর্ড করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। তবে এখন পর্যন্ত অভিযুক্তরা বাছুরটি যে অবৈধ ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল, তার কোনো দালিলিক প্রমাণ পুলিশের কাছে পেশ করতে পারেনি।

ঘটনাটি ২৮ ফেব্রুয়ারি বেতিয়ার নৌতন থানা এলাকার খাড্ডা কুজালহি গ্রামে ঘটে। ভুক্তভোগী শেখ নানহে জানান, তিনি স্থানীয় বাজার থেকে মাত্র ২,৮০০ রুপিতে একটি বাছুর কিনেছিলেন বাড়িতে লালন-পালন করার জন্য। বাড়ি ফেরার পথে একদল যুবক তাকে ঘিরে ধরে এবং মারধর শুরু করে।

ভুক্তভোগী শেখ নানহের ভাষ্য:

"আমি তাদের বারবার বলেছি যে আমি একজন দরিদ্র কৃষক, কসাই বা ব্যবসায়ী নই। বাছুরটি আমি পালার জন্য কিনেছি। আমি তাদের কাছে প্রাণের ভিক্ষা চেয়েছি, কিন্তু তারা শোনেনি। তারা আমাকে নির্মমভাবে পেটাতে থাকে এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে।"

হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ঘটনায় নৌতন থানায় শেখ নানহে দুইজনের নাম উল্লেখ করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "সাধারণ কেনাকাটার জন্য যদি এভাবে গণপিটুনির শিকার হতে হয়, তবে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?"

বিহারে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুসলিমদের ওপর এই ধরনের পরিকল্পিত হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

  • ডিসেম্বর ২০২৫: নওয়াদায় আতহার হোসেন নামের এক কাপড় ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
  • ২০২৫ (কিষাণগঞ্জ): সাব্বির আলম নামের এক ব্যক্তিকে চুরির অপবাদে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
  • জানুয়ারি ২০২৬: মধুবনীতে এক মুসলিম শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ অপবাদে মারধর করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, আইনের শাসনের অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এই ধরনের ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনির সাহস জোগাচ্ছে। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে শারীরিক নির্যাতন বা লাঞ্ছিত করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত