উত্তরাখণ্ডের উধম সিং নগরে এক মুসলিম নাবালিকাকে পথরোধ করে ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত এবং জোরপূর্বক নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্লোগান দেওয়ানোর অভিযোগ উঠেছে উগ্রবাদী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত অরবিন্দ শর্মা এর আগেও একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে নামাজরত অবস্থায় মারধরের দায়ে আলোচিত ও গ্রেপ্তার হয়েছিল। একের পর এক এই ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার মূল অভিযুক্ত অরবিন্দ শর্মা নিজেকে উধম সিং নগরের ‘অটরিয়া দেবী মন্দির’-এর ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচয় দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সে নাবালিকা শিশুটির ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে জেরা করছে। অভিযুক্তের দাবি অনুযায়ী, সে কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, বরং ‘সর্বজনীন ঈশ্বর’ তত্ত্বের দোহাই দিয়ে নিজের ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিল। তার ভাষ্যমতে, যদি কেউ কলেমা পড়তে পারে, তবে সে কেন অন্য ধর্মের স্লোগান দিতে পারবে না—এই যুক্তিতেই সে শিশুটিকে বাধ্য করে। এর আগে এক বৃদ্ধ ব্যক্তিকে নামাজ পড়ার সময় লাঠিপেটা করার ঘটনায় অভিযুক্ত অরবিন্দ দাবি করেছিল যে, মন্দির সংলগ্ন এলাকায় নামাজ পড়া ‘অবৈধ’। অভিযুক্তের সমর্থকদের দাবি, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক হামলা নয় বরং নিজের ধর্মের প্রতি অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, অরবিন্দ শর্মা তার গাড়ি থামিয়ে এক মুসলিম নাবালিকাকে ডেকে তার ধর্ম জিজ্ঞেস করে। এরপর শিশুটি ‘আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখে’ বলার পর অরবিন্দ তাকে কলেমা পড়তে বলে এবং চাপের মুখে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করে। ভিডিওতে শিশুটির চোখে-মুখে স্পষ্ট ভীতি ও আতঙ্ক পরিলক্ষিত হয়।
এর মাত্র কয়েকদিন আগে, একই ব্যক্তি ওই এলাকায় নামাজরত অবস্থায় শহীদ নামের এক মুসলিম বৃদ্ধকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিল। সেই ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে ইদানীং মুসলিমদের প্রকাশ্যে ইবাদত করা বা চলাফেরার সময় হেনস্থা করার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। উধম সিং নগরের এসএসপি অজয় গণপতি জানিয়েছেন যে, অরবিন্দ শর্মাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করা বা ইবাদত করার সময় শারীরিকভাবে আক্রমণ করা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার উত্তরাখণ্ডে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র সাধারণ ধারায় মামলা করলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না; বরং এই ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা মনস্তাত্ত্বিক উস্কানি বন্ধ করা জরুরি। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই নির্ভয়ে নিজ ধর্ম চর্চা করতে পারে। প্রকৃত ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন অপরাধের পেছনের সাম্প্রদায়িক মদতদাতাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
বিষয় : ভারত

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ মার্চ ২০২৬
উত্তরাখণ্ডের উধম সিং নগরে এক মুসলিম নাবালিকাকে পথরোধ করে ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত এবং জোরপূর্বক নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্লোগান দেওয়ানোর অভিযোগ উঠেছে উগ্রবাদী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত অরবিন্দ শর্মা এর আগেও একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে নামাজরত অবস্থায় মারধরের দায়ে আলোচিত ও গ্রেপ্তার হয়েছিল। একের পর এক এই ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার মূল অভিযুক্ত অরবিন্দ শর্মা নিজেকে উধম সিং নগরের ‘অটরিয়া দেবী মন্দির’-এর ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচয় দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সে নাবালিকা শিশুটির ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে জেরা করছে। অভিযুক্তের দাবি অনুযায়ী, সে কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, বরং ‘সর্বজনীন ঈশ্বর’ তত্ত্বের দোহাই দিয়ে নিজের ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিল। তার ভাষ্যমতে, যদি কেউ কলেমা পড়তে পারে, তবে সে কেন অন্য ধর্মের স্লোগান দিতে পারবে না—এই যুক্তিতেই সে শিশুটিকে বাধ্য করে। এর আগে এক বৃদ্ধ ব্যক্তিকে নামাজ পড়ার সময় লাঠিপেটা করার ঘটনায় অভিযুক্ত অরবিন্দ দাবি করেছিল যে, মন্দির সংলগ্ন এলাকায় নামাজ পড়া ‘অবৈধ’। অভিযুক্তের সমর্থকদের দাবি, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক হামলা নয় বরং নিজের ধর্মের প্রতি অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, অরবিন্দ শর্মা তার গাড়ি থামিয়ে এক মুসলিম নাবালিকাকে ডেকে তার ধর্ম জিজ্ঞেস করে। এরপর শিশুটি ‘আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখে’ বলার পর অরবিন্দ তাকে কলেমা পড়তে বলে এবং চাপের মুখে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করে। ভিডিওতে শিশুটির চোখে-মুখে স্পষ্ট ভীতি ও আতঙ্ক পরিলক্ষিত হয়।
এর মাত্র কয়েকদিন আগে, একই ব্যক্তি ওই এলাকায় নামাজরত অবস্থায় শহীদ নামের এক মুসলিম বৃদ্ধকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিল। সেই ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে ইদানীং মুসলিমদের প্রকাশ্যে ইবাদত করা বা চলাফেরার সময় হেনস্থা করার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। উধম সিং নগরের এসএসপি অজয় গণপতি জানিয়েছেন যে, অরবিন্দ শর্মাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করা বা ইবাদত করার সময় শারীরিকভাবে আক্রমণ করা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার উত্তরাখণ্ডে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র সাধারণ ধারায় মামলা করলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না; বরং এই ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা মনস্তাত্ত্বিক উস্কানি বন্ধ করা জরুরি। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই নির্ভয়ে নিজ ধর্ম চর্চা করতে পারে। প্রকৃত ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন অপরাধের পেছনের সাম্প্রদায়িক মদতদাতাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।

আপনার মতামত লিখুন