শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

ট্রাক চালক আমিরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দাবি পরিবারের

গরু পাচারের সন্দেহে পিটিয়ে ও মাথায় গুলি করে মুসলিম যুবককে হত্যা



গরু পাচারের সন্দেহে পিটিয়ে ও মাথায় গুলি করে মুসলিম যুবককে হত্যা

হরিয়ানার পাল্লা গ্রামের ২৮ বছর বয়সী ট্রাক চালক আমিরকে রাজস্থানের ভিওয়ারিতে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বজরং দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে। গত ২ মার্চ দিবাগত রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় নিহতের পরিবার ইনসাফের দাবি জানিয়েছে। পুলিশ একটি হত্যা মামলা দায়ের করলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

রাজস্থান পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ দিতে গিয়ে ভিওয়ারির ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট (DSP) কৈলাশ চৌধুরী জানান, ৩ মার্চ ভোরে তাদের কাছে তথ্য আসে যে গবাদিপশু বোঝাই একটি পিকআপ ভ্যান তপুখড়া থেকে তাওয়াদুর দিকে যাচ্ছে এবং কিছু লোক সেটিকে তাড়া করছে। সারে কালা গ্রামের কাছে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও পাথর ছোঁড়াছুঁড়ির ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি গরু উদ্ধার করা হয়েছে এবং পিকআপ ভ্যানটিতে পাথর বোঝাই ছিল।

পুলিশের ভাষ্যমতে, আমির সেই সংঘর্ষের সময় গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুর সঠিক কারণ ‘পাথরের আঘাত’ নাকি ‘গুলি’—তা ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের আগে নিশ্চিতভাবে বলতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। এদিকে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসলেও, স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা বিষয়টিকে ‘গো-পাচার রোধে জনরোষ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।

নিহত আমির (২৮) হরিয়ানার পাল্লা গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ট্রাক চালক ছিলেন। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ২ মার্চ রাতে তিনি তার পিকআপ ভ্যানে করে সবজি বা প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমিরের চাচা জুবায়েরের অভিযোগ, "বজরং দলের সদস্যরা তাদের গাড়ি দিয়ে আমিরের পিকআপে ধাক্কা দেয়। গাড়িটি থামার পর কোনো কথা না বলেই আমিরের মাথায় গুলি করা হয়।"

ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ইউআইটি থানা ও পরে চোপানকি থানায় গেলেও পুলিশ শুরুতে আমিরের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয়নি বলে অভিযোগ। পরে একটি সরকারি হাসপাতালে আমিরের নিথর দেহ খুঁজে পান তারা। আমির ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং তিন সন্তান রয়েছে (যাদের মধ্যে দুইজন আগেই মারা গেছে)। আগামী মাসে তার ছোট বোনের বিয়ের কথা ছিল, যার সমস্ত খরচ আমিরের কাঁধেই ছিল। আমিরের দাদা নাসরু বলেন, "ও কেবল পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ট্রাক চালাত। মুসলিম বলেই তাকে গো-পাচারের তকমা দিয়ে মেরে ফেলা হলো।"

রাজস্থানের আলওয়ার ও ভিওয়ারি অঞ্চলটি গত কয়েক বছর ধরে স্বঘোষিত ‘গো-রক্ষক’দের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে পেহলু খান, ২০১৮ সালে রাকবর খান এবং ২০২৩ সালে জুনায়েদ ও নাসিরের হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো জনমনে টাটকা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে, আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে রাজপথে বিচার ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য চরম হুমকি।

ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো সন্দেহ বা অভিযোগ থাকলেই কাউকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠনকে দেওয়া হয়নি। আমিরের ঘটনায় পুলিশের বয়ানে ‘পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি’র কথা বলা হলেও পরিবারের দাবি অনুযায়ী ‘মাথায় গুলি’র বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের দাবি রাখে। যদি এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ ময়নাতদন্ত এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনাই এখন প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


গরু পাচারের সন্দেহে পিটিয়ে ও মাথায় গুলি করে মুসলিম যুবককে হত্যা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬

featured Image

হরিয়ানার পাল্লা গ্রামের ২৮ বছর বয়সী ট্রাক চালক আমিরকে রাজস্থানের ভিওয়ারিতে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বজরং দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে। গত ২ মার্চ দিবাগত রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় নিহতের পরিবার ইনসাফের দাবি জানিয়েছে। পুলিশ একটি হত্যা মামলা দায়ের করলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

রাজস্থান পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ দিতে গিয়ে ভিওয়ারির ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট (DSP) কৈলাশ চৌধুরী জানান, ৩ মার্চ ভোরে তাদের কাছে তথ্য আসে যে গবাদিপশু বোঝাই একটি পিকআপ ভ্যান তপুখড়া থেকে তাওয়াদুর দিকে যাচ্ছে এবং কিছু লোক সেটিকে তাড়া করছে। সারে কালা গ্রামের কাছে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও পাথর ছোঁড়াছুঁড়ির ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি গরু উদ্ধার করা হয়েছে এবং পিকআপ ভ্যানটিতে পাথর বোঝাই ছিল।

পুলিশের ভাষ্যমতে, আমির সেই সংঘর্ষের সময় গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুর সঠিক কারণ ‘পাথরের আঘাত’ নাকি ‘গুলি’—তা ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের আগে নিশ্চিতভাবে বলতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। এদিকে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসলেও, স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা বিষয়টিকে ‘গো-পাচার রোধে জনরোষ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।

নিহত আমির (২৮) হরিয়ানার পাল্লা গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ট্রাক চালক ছিলেন। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ২ মার্চ রাতে তিনি তার পিকআপ ভ্যানে করে সবজি বা প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমিরের চাচা জুবায়েরের অভিযোগ, "বজরং দলের সদস্যরা তাদের গাড়ি দিয়ে আমিরের পিকআপে ধাক্কা দেয়। গাড়িটি থামার পর কোনো কথা না বলেই আমিরের মাথায় গুলি করা হয়।"

ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ইউআইটি থানা ও পরে চোপানকি থানায় গেলেও পুলিশ শুরুতে আমিরের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয়নি বলে অভিযোগ। পরে একটি সরকারি হাসপাতালে আমিরের নিথর দেহ খুঁজে পান তারা। আমির ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং তিন সন্তান রয়েছে (যাদের মধ্যে দুইজন আগেই মারা গেছে)। আগামী মাসে তার ছোট বোনের বিয়ের কথা ছিল, যার সমস্ত খরচ আমিরের কাঁধেই ছিল। আমিরের দাদা নাসরু বলেন, "ও কেবল পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ট্রাক চালাত। মুসলিম বলেই তাকে গো-পাচারের তকমা দিয়ে মেরে ফেলা হলো।"

রাজস্থানের আলওয়ার ও ভিওয়ারি অঞ্চলটি গত কয়েক বছর ধরে স্বঘোষিত ‘গো-রক্ষক’দের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে পেহলু খান, ২০১৮ সালে রাকবর খান এবং ২০২৩ সালে জুনায়েদ ও নাসিরের হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো জনমনে টাটকা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে, আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে রাজপথে বিচার ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য চরম হুমকি।

ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো সন্দেহ বা অভিযোগ থাকলেই কাউকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠনকে দেওয়া হয়নি। আমিরের ঘটনায় পুলিশের বয়ানে ‘পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি’র কথা বলা হলেও পরিবারের দাবি অনুযায়ী ‘মাথায় গুলি’র বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের দাবি রাখে। যদি এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ ময়নাতদন্ত এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনাই এখন প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত