শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

ক্রমাগত বাড়তে থাকা ইসলামোফোবিয়া ও অসহিষ্ণুতার বলি ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল সালাম

গালিগালাজের প্রতিবাদ করায় লোহা দিয়ে মুসলিম বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা



গালিগালাজের প্রতিবাদ করায় লোহা দিয়ে মুসলিম বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা

ভারতের বিহার রাজ্যের দ্বারভাঙ্গা জেলায় এক ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ১ মার্চ ঝাগারুয়া গ্রামে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ ও ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের প্রতিবাদ করায় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল সালামকে লোহার রড ও খন্তি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পরিবারের তিন সদস্যসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঘটনার সূত্রপাত হয় অভিযুক্ত মণীশ কুমার রামের বাড়ি থেকে কিছু ইট চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। মণীশ কুমারের পরিবার প্রাথমিক অভিযোগে দাবি করার চেষ্টা করেছিল যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে এই দাবির সত্যতা মেলেনি। অভিযুক্ত বিমলা দেবী এবং তার ছেলেরা ওই সময় উত্তেজিত অবস্থায় ছিলেন এবং তাদের দাবি ছিল যে, স্থানীয় এক বিরোধের জেরে তারা ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাদের পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডকে একটি আকস্মিক ঝগড়ার পরিণতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, উসকানিমূলক সাম্প্রদায়িক স্লোগান ব্যবহারের বিষয়টি তারা অস্বীকার করেনি।

গত ১ মার্চ বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার জামালপুর থানার অন্তর্গত ঝাগারুয়া গ্রামে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। নিহত আব্দুল সালাম পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের আত্মীয় শাহীন নোমান জানান, আব্দুল সালাম প্রতিদিনের মতো তার দোকানে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি দেখেন মণীশ কুমার রামের মা বিমলা দেবী মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ করছেন।

৬৫ বছর বয়সী সালাম অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এর প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, "যদি কেউ অপরাধ (ইট চুরি) করে থাকে, তবে তাকে নির্দিষ্ট করে অভিযুক্ত করুন, পুরো সম্প্রদায়কে গালি দিচ্ছেন কেন?" এই প্রতিবাদেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মণীশ কুমার রাম, তার ভাই রোশন কুমার এবং মা বিমলা দেবী। মণীশ একটি লোহার খন্তি (মাটি খোঁড়ার যন্ত্র) দিয়ে বৃদ্ধ সালামের মাথায় সজোরে আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। তাকে কিরাতপুর কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ একটি বাকবিতণ্ডায় একজন বৃদ্ধকে প্রাণ দিতে হওয়ায় পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রামে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে এবং সিনিয়র ডিআইজি মনোজ তিওয়ারি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কৌশল কিশোর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের ওপর এ ধরনের "মব ভায়োলেন্স" বা গোষ্ঠীগত হামলার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঝাগারুয়া গ্রামের এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলিমরা অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, যা কোনো বড় ধরনের দাঙ্গা এড়াতে সাহায্য করেছে— খোদ পুলিশ প্রশাসনও এই ধৈর্যের প্রশংসা করেছে। তবে প্রশ্ন উঠছে জবাবদিহিতা নিয়ে। কেবল গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়, বরং কেন বারবার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সাধারণ বিবাদ প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে, সেই গভীর সামাজিক ব্যাধির বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, ধর্মীয় উসকানিদাতা ও ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


গালিগালাজের প্রতিবাদ করায় লোহা দিয়ে মুসলিম বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতের বিহার রাজ্যের দ্বারভাঙ্গা জেলায় এক ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ১ মার্চ ঝাগারুয়া গ্রামে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ ও ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের প্রতিবাদ করায় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল সালামকে লোহার রড ও খন্তি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পরিবারের তিন সদস্যসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঘটনার সূত্রপাত হয় অভিযুক্ত মণীশ কুমার রামের বাড়ি থেকে কিছু ইট চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। মণীশ কুমারের পরিবার প্রাথমিক অভিযোগে দাবি করার চেষ্টা করেছিল যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে এই দাবির সত্যতা মেলেনি। অভিযুক্ত বিমলা দেবী এবং তার ছেলেরা ওই সময় উত্তেজিত অবস্থায় ছিলেন এবং তাদের দাবি ছিল যে, স্থানীয় এক বিরোধের জেরে তারা ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাদের পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডকে একটি আকস্মিক ঝগড়ার পরিণতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, উসকানিমূলক সাম্প্রদায়িক স্লোগান ব্যবহারের বিষয়টি তারা অস্বীকার করেনি।

গত ১ মার্চ বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার জামালপুর থানার অন্তর্গত ঝাগারুয়া গ্রামে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। নিহত আব্দুল সালাম পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের আত্মীয় শাহীন নোমান জানান, আব্দুল সালাম প্রতিদিনের মতো তার দোকানে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি দেখেন মণীশ কুমার রামের মা বিমলা দেবী মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ করছেন।

৬৫ বছর বয়সী সালাম অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এর প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, "যদি কেউ অপরাধ (ইট চুরি) করে থাকে, তবে তাকে নির্দিষ্ট করে অভিযুক্ত করুন, পুরো সম্প্রদায়কে গালি দিচ্ছেন কেন?" এই প্রতিবাদেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মণীশ কুমার রাম, তার ভাই রোশন কুমার এবং মা বিমলা দেবী। মণীশ একটি লোহার খন্তি (মাটি খোঁড়ার যন্ত্র) দিয়ে বৃদ্ধ সালামের মাথায় সজোরে আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। তাকে কিরাতপুর কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ একটি বাকবিতণ্ডায় একজন বৃদ্ধকে প্রাণ দিতে হওয়ায় পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রামে পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে এবং সিনিয়র ডিআইজি মনোজ তিওয়ারি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কৌশল কিশোর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের ওপর এ ধরনের "মব ভায়োলেন্স" বা গোষ্ঠীগত হামলার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঝাগারুয়া গ্রামের এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলিমরা অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, যা কোনো বড় ধরনের দাঙ্গা এড়াতে সাহায্য করেছে— খোদ পুলিশ প্রশাসনও এই ধৈর্যের প্রশংসা করেছে। তবে প্রশ্ন উঠছে জবাবদিহিতা নিয়ে। কেবল গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়, বরং কেন বারবার ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সাধারণ বিবাদ প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে, সেই গভীর সামাজিক ব্যাধির বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, ধর্মীয় উসকানিদাতা ও ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত