ভারতের গুজরাট রাজ্যের ঐতিহাসিক শহর ভারুচে অবস্থিত প্রাচীন জামে মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করার এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ মার্চ একদল নারী মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে হিন্দুয়ানি পূজা ও ধর্মীয় আচার পালন করেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুসলিমদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও মসজিদ ট্রাস্ট প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিবদমান এই পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থী হিন্দু ধর্মীয় নেতা মুক্তানন্দ স্বামী ও তার অনুসারীরা ভিন্ন যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি মূলত একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির ছিল। এই দাবির সপক্ষে জনমত গড়তে মুক্তানন্দ স্বামী সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলন করেন এবং ‘ভারুচের জাতীয় ঐতিহ্যের প্রকৃত ইতিহাস’ শীর্ষক একটি বই প্রকাশ করেন।
মুক্তানন্দ স্বামী ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (ASI) সমালোচনা করে বলেন, "এই স্থাপনার ঐতিহাসিক পটভূমি সঠিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। আমরা চাই সত্য উন্মোচিত হোক।" নিজের দাবির পক্ষে চাপ সৃষ্টি করতে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, আগামী এপ্রিল মাস থেকে প্রতি সোমবার কালেক্টর অফিসের সামনে প্রতীকী অনশন এবং 'হনুমান চালিশা' পাঠ করা হবে। তাদের পক্ষ থেকে এই কর্মকাণ্ডকে ‘শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে ৩ মার্চ, ভারুচের পায়োনিয়ার স্কুলের বিপরীতে অবস্থিত ঐতিহাসিক জামে মসজিদে। সুরাট থেকে আসা একদল নারী হঠাৎ মসজিদের চত্বরে প্রবেশ করে পূজা শুরু করেন। মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও উপস্থিত মুসল্লিরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা তা উপেক্ষা করে ভিডিও ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে তা পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেন।
জামে মসজিদ ট্রাস্টের সভাপতি মাওলানা কুরাইশি গোলাম মোস্তফা এই ঘটনাকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, "এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং শহরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য এটি একটি সুপরিকল্পিত উস্কানি। মসজিদ মুসলিমদের ইবাদতগাহ, এখানে অন্য ধর্মের আচার পালন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
ঘটনার পর পরই জামে মসজিদ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জেলা কালেক্টর, পুলিশ সুপার এবং বি-ডিভিশন থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগ, মুক্তানন্দ স্বামীর মতো কট্টরপন্থীরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এই ঐতিহাসিক মসজিদের ওপর ভিত্তিহীন দাবি তুলছে, যা এলাকার শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, ভারুচের এই জামে মসজিদটি এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী স্থাপনা। ১৯৬৫ সাল থেকে এর একটি অংশ ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (ASI) কর্তৃক সংরক্ষিত হিসেবে তালিকাভুক্ত। কয়েক প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মুসলিমরা এখানে নিয়মিত সালাত আদায় করে আসছেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের পবিত্রতা রক্ষার অধিকার রয়েছে। ১৯৯১ সালের ‘উপাসনালয় আইন’ (Places of Worship Act, 1991) অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের সময় কোনো উপাসনালয় যে অবস্থায় ছিল, তার ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তন করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায় বা আইনি সিদ্ধান্ত ছাড়াই জোরপূর্বক কোনো উপাসনালয়ে অন্য ধর্মের আচার পালন করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি কেবল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি এক প্রকার চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের উচিত কোনো পক্ষের চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক ও আইনি মর্যাদা রক্ষা করা। উস্কানিদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাতে কোনো গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে।
বিষয় : ভারত

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মার্চ ২০২৬
ভারতের গুজরাট রাজ্যের ঐতিহাসিক শহর ভারুচে অবস্থিত প্রাচীন জামে মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করার এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ মার্চ একদল নারী মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে হিন্দুয়ানি পূজা ও ধর্মীয় আচার পালন করেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুসলিমদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও মসজিদ ট্রাস্ট প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিবদমান এই পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থী হিন্দু ধর্মীয় নেতা মুক্তানন্দ স্বামী ও তার অনুসারীরা ভিন্ন যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি মূলত একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির ছিল। এই দাবির সপক্ষে জনমত গড়তে মুক্তানন্দ স্বামী সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলন করেন এবং ‘ভারুচের জাতীয় ঐতিহ্যের প্রকৃত ইতিহাস’ শীর্ষক একটি বই প্রকাশ করেন।
মুক্তানন্দ স্বামী ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (ASI) সমালোচনা করে বলেন, "এই স্থাপনার ঐতিহাসিক পটভূমি সঠিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। আমরা চাই সত্য উন্মোচিত হোক।" নিজের দাবির পক্ষে চাপ সৃষ্টি করতে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, আগামী এপ্রিল মাস থেকে প্রতি সোমবার কালেক্টর অফিসের সামনে প্রতীকী অনশন এবং 'হনুমান চালিশা' পাঠ করা হবে। তাদের পক্ষ থেকে এই কর্মকাণ্ডকে ‘শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে ৩ মার্চ, ভারুচের পায়োনিয়ার স্কুলের বিপরীতে অবস্থিত ঐতিহাসিক জামে মসজিদে। সুরাট থেকে আসা একদল নারী হঠাৎ মসজিদের চত্বরে প্রবেশ করে পূজা শুরু করেন। মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও উপস্থিত মুসল্লিরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা তা উপেক্ষা করে ভিডিও ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে তা পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেন।
জামে মসজিদ ট্রাস্টের সভাপতি মাওলানা কুরাইশি গোলাম মোস্তফা এই ঘটনাকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, "এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং শহরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য এটি একটি সুপরিকল্পিত উস্কানি। মসজিদ মুসলিমদের ইবাদতগাহ, এখানে অন্য ধর্মের আচার পালন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
ঘটনার পর পরই জামে মসজিদ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জেলা কালেক্টর, পুলিশ সুপার এবং বি-ডিভিশন থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগ, মুক্তানন্দ স্বামীর মতো কট্টরপন্থীরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এই ঐতিহাসিক মসজিদের ওপর ভিত্তিহীন দাবি তুলছে, যা এলাকার শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, ভারুচের এই জামে মসজিদটি এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী স্থাপনা। ১৯৬৫ সাল থেকে এর একটি অংশ ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (ASI) কর্তৃক সংরক্ষিত হিসেবে তালিকাভুক্ত। কয়েক প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মুসলিমরা এখানে নিয়মিত সালাত আদায় করে আসছেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের পবিত্রতা রক্ষার অধিকার রয়েছে। ১৯৯১ সালের ‘উপাসনালয় আইন’ (Places of Worship Act, 1991) অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের সময় কোনো উপাসনালয় যে অবস্থায় ছিল, তার ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তন করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায় বা আইনি সিদ্ধান্ত ছাড়াই জোরপূর্বক কোনো উপাসনালয়ে অন্য ধর্মের আচার পালন করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি কেবল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি এক প্রকার চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের উচিত কোনো পক্ষের চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক ও আইনি মর্যাদা রক্ষা করা। উস্কানিদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাতে কোনো গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে।

আপনার মতামত লিখুন