শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

যুক্তরাজ্যের মূলধারার গণমাধ্যমে মুসলিম ও ইসলাম নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ৭০ শতাংশই নেতিবাচক এবং প্রায় অর্ধেক সরাসরি পক্ষপাতমূলক বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে

ব্রিটিশ মিডিয়ায় ইসলামভীতি: অর্ধেক সংবাদই পক্ষপাতদুষ্ট ও নেতিবাচক



ব্রিটিশ মিডিয়ায় ইসলামভীতি: অর্ধেক সংবাদই পক্ষপাতদুষ্ট ও নেতিবাচক

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমে মুসলিম এবং ইসলামি বিষয়াবলি উপস্থাপনে চরম ভারসাম্যহীনতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের প্রমাণ মিলেছে। সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং (CfMM)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্রিটিশ মিডিয়ার একটি বড় অংশ বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে ইসলামভীতি ও নেতিবাচক বয়ান তৈরিতে লিপ্ত।

যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী এবং রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম সম্প্রদায়কে একটি বিশেষ ছাঁচে উপস্থাপনের দাবি করে আসছে। 'দ্য স্পেকটেটর', 'জিবি নিউজ', 'দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ' এবং 'দ্য ডেইলি মেইল'-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে প্রায়শই মুসলিমদের "সংঘাত, হুমকি বা বিতর্কের" উৎস হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। সমালোচক ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, তারা জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক সংহতির প্রশ্নে এই বিষয়গুলো তুলে ধরে। তবে CfMM-এর তথ্যমতে, এই প্রতিবেদনগুলোর একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৪৪ শতাংশ) কোনো সঠিক প্রেক্ষাপট বা 'কনটেক্সট' ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়। বিশেষ করে 'দ্য স্পেকটেটর'-এর প্রতি চারটি সংবাদের একটিতে চরম পর্যায়ের পক্ষপাত লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া 'জিবি নিউজ' এবং 'ডেইলি টেলিগ্রাফ'-এর মতো মাধ্যমগুলোতে মুসলিমদের নিয়ে সাধারণীকরণ বা পাইকারি হারের নেতিবাচক প্রচারণার হার যথাক্রমে ৩৯% ও ৩২%।

লন্ডনভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং (CfMM) তাদের "২০২৫-এ ব্রিটিশ মিডিয়ার অবস্থা: মুসলিম এবং ইসলাম সংক্রান্ত প্রতিবেদন" শীর্ষক গবেষণায় ৩০টি বড় মিডিয়া আউটলেটের মোট ৪০,৯১৩টি সংবাদ বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিবেদনটি ১০ মার্চ, ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী:

  • মুসলিম বিষয়ক মোট সংবাদের প্রায় ৫০ শতাংশই পরিমাপযোগ্য মাত্রায় পক্ষপাতদুষ্ট।
  • ৭০ শতাংশ সংবাদে মুসলিম বা ইসলামকে নেতিবাচক কোনো কাজ বা থিমের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
  • ডানপন্থী মিডিয়াগুলো সবচেয়ে ক্ষতিকর কন্টেন্ট তৈরি করছে, যেখানে মুসলিমদের একটি "সমষ্টিগত হুমকি" হিসেবে দেখানোর প্রবণতা প্রবল।

এই মিডিয়া ট্রায়ালের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের ওপর পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমের এই নেতিবাচক উপস্থাপনের সাথে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভীতিমূলক অপরাধ (Hate Crime) বৃদ্ধি এবং মুসলিমবিরোধী কঠোর সরকারি নীতির প্রতি জনসমর্থন বাড়ার একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। ভুক্তভোগী ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মতে, মিডিয়ার এই একপাক্ষিক আচরণ যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিমদের সামাজিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেতিবাচক বয়ান তৈরি করা গণমাধ্যমের মৌলিক আদর্শের পরিপন্থী। CfMM-এর পরিচালক রিজওয়ানা হামিদ এই পরিস্থিতিকে মিডিয়া ইকোসিস্টেমের একটি "সিস্টেমেটিক বা কাঠামোগত সমস্যা" হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক পিটার ওবোর্ন একে ব্রিটিশ মুসলিমদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিচারের একটি ভয়াবহ স্মারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যমের দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। ব্রিটিশ মিডিয়া রেগুলেটরি বডি এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উচিত এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা।

বিষয় : যুক্তরাজ্য মিডিয়া

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


ব্রিটিশ মিডিয়ায় ইসলামভীতি: অর্ধেক সংবাদই পক্ষপাতদুষ্ট ও নেতিবাচক

প্রকাশের তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬

featured Image

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমে মুসলিম এবং ইসলামি বিষয়াবলি উপস্থাপনে চরম ভারসাম্যহীনতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের প্রমাণ মিলেছে। সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং (CfMM)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্রিটিশ মিডিয়ার একটি বড় অংশ বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে ইসলামভীতি ও নেতিবাচক বয়ান তৈরিতে লিপ্ত।

যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী এবং রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম সম্প্রদায়কে একটি বিশেষ ছাঁচে উপস্থাপনের দাবি করে আসছে। 'দ্য স্পেকটেটর', 'জিবি নিউজ', 'দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ' এবং 'দ্য ডেইলি মেইল'-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে প্রায়শই মুসলিমদের "সংঘাত, হুমকি বা বিতর্কের" উৎস হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। সমালোচক ও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, তারা জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক সংহতির প্রশ্নে এই বিষয়গুলো তুলে ধরে। তবে CfMM-এর তথ্যমতে, এই প্রতিবেদনগুলোর একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৪৪ শতাংশ) কোনো সঠিক প্রেক্ষাপট বা 'কনটেক্সট' ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়। বিশেষ করে 'দ্য স্পেকটেটর'-এর প্রতি চারটি সংবাদের একটিতে চরম পর্যায়ের পক্ষপাত লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া 'জিবি নিউজ' এবং 'ডেইলি টেলিগ্রাফ'-এর মতো মাধ্যমগুলোতে মুসলিমদের নিয়ে সাধারণীকরণ বা পাইকারি হারের নেতিবাচক প্রচারণার হার যথাক্রমে ৩৯% ও ৩২%।

লন্ডনভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং (CfMM) তাদের "২০২৫-এ ব্রিটিশ মিডিয়ার অবস্থা: মুসলিম এবং ইসলাম সংক্রান্ত প্রতিবেদন" শীর্ষক গবেষণায় ৩০টি বড় মিডিয়া আউটলেটের মোট ৪০,৯১৩টি সংবাদ বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিবেদনটি ১০ মার্চ, ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী:

  • মুসলিম বিষয়ক মোট সংবাদের প্রায় ৫০ শতাংশই পরিমাপযোগ্য মাত্রায় পক্ষপাতদুষ্ট।
  • ৭০ শতাংশ সংবাদে মুসলিম বা ইসলামকে নেতিবাচক কোনো কাজ বা থিমের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
  • ডানপন্থী মিডিয়াগুলো সবচেয়ে ক্ষতিকর কন্টেন্ট তৈরি করছে, যেখানে মুসলিমদের একটি "সমষ্টিগত হুমকি" হিসেবে দেখানোর প্রবণতা প্রবল।

এই মিডিয়া ট্রায়ালের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের ওপর পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যমের এই নেতিবাচক উপস্থাপনের সাথে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভীতিমূলক অপরাধ (Hate Crime) বৃদ্ধি এবং মুসলিমবিরোধী কঠোর সরকারি নীতির প্রতি জনসমর্থন বাড়ার একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। ভুক্তভোগী ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মতে, মিডিয়ার এই একপাক্ষিক আচরণ যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিমদের সামাজিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেতিবাচক বয়ান তৈরি করা গণমাধ্যমের মৌলিক আদর্শের পরিপন্থী। CfMM-এর পরিচালক রিজওয়ানা হামিদ এই পরিস্থিতিকে মিডিয়া ইকোসিস্টেমের একটি "সিস্টেমেটিক বা কাঠামোগত সমস্যা" হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক পিটার ওবোর্ন একে ব্রিটিশ মুসলিমদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিচারের একটি ভয়াবহ স্মারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যমের দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। ব্রিটিশ মিডিয়া রেগুলেটরি বডি এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উচিত এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত