ভারতের আসাম রাজ্যে সাম্প্রতিক ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অন্যতম ভয়াবহ বন্যায় যখন লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন এবং চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি, ঠিক তখন সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ঘৃণামূলক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। 'হিন্দু সুরক্ষা সেনা' নামে একটি গোষ্ঠী আসামের হিন্দু অধিবাসীদের প্রতি মুসলিম ব্যক্তি ও দাতব্য সংস্থার ত্রাণ গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছে। অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (AIUDF) সভাপতি বদরুদ্দিন আজমল ও বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া জীবনরক্ষাকারী খাদ্য, ওষুধ ও আর্থিক সহায়তা বয়কটের এই ঘৃণ্য আহ্বানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও মানবাধিকার কর্মীরা।ভারতে আসাম রাজ্যের লাখ লাখ পরিবার যখন ভয়াবহ বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে জীবন বাঁচানোর আকুল আকুতি জানাচ্ছে, তখন সেখানে চরমপন্থী গোষ্ঠীর উসকানিমূলক তৎপরতা চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রাজ্যে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে 'হিন্দু সুরক্ষা সেনা' নামের একটি চরমপন্থী হিন্দু সংগঠন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা কোনো মুসলিম ব্যক্তি বা দাতব্য সংস্থার পক্ষ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ না করে। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য ও অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (AIUDF)-এর সভাপতি বদরুদ্দিন আজমলের ত্রাণ বয়কট করার জন্য প্রকাশ্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আসামের বহু জেলা প্লাবিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে ও আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন। এমন কঠিন মুহূর্তে সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, দাতব্য সংস্থা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ নাগরিকরা ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছে।সংকটময় এই মুহূর্তে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে আজমল ফাউন্ডেশনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মুসলিম দাতব্য সংস্থা। AIUDF প্রধান বদরুদ্দিন আজমল ইতোমধ্যে বন্যা দুর্গতদের জন্য কোটি কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি নিজে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি মেডিকেল টিম ও বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র বিতরণ করছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি অসহায় পরিবারের হাতেই এই সহায়তা তুলে দেওয়া হচ্ছে।তবে মানবিক এই সংকটকে পুঁজি করে বিভাজন সৃষ্টির চক্রান্তে নেমেছে উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনটি। ‘হিন্দু সুরক্ষা সেনা’ নামের সংগঠনটি এক খোলা চিঠিতে আসামের হিন্দু সম্প্রদায়কে আজমলের সাহায্য গ্রহণ না করার আহ্বান জানায়। তাদের দাবি, মুসলিমদের এই সাহায্য নাকি "অসমীয়া জাতির স্বার্থের পরিপন্থী"। চিঠিতে সই করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মিঠুন দাস। তিনি বদরুদ্দিন আজমলের ঘোষিত ত্রাণের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইতিহাস টেনে আনার চেষ্টা করেন এবং মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য প্রকাশ করেন।মিঠুন দাস বলেন, "আজমল ২ কোটি বা ২,০০০ কোটি রুপি দান করতে পারেন, কিন্তু এতে আদিবাসী ও হিন্দুদের ওপর অতীতের তথাকথিত আক্রমণের ইতিহাস মুছে যাবে না।"উগ্রপন্থীদের এমন ঘৃণাত্মক অবস্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন আসামের মানবাধিকার কর্মী ও মুসলিম নেতৃবৃন্দ। ‘খুদাই খিদমতগার আসাম প্রদেশ’-এর সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইলিয়াস আহমেদ বলেন, "দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে যখন মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত, তখন এই ধরনের সংগঠনগুলো বিভেদ তৈরির ষড়যন্ত্র করছে। তারা দুর্যোগের সময় বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ায় না, বরং হিন্দু-মুসলিম শত্রুতা সৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকে।"ইলিয়াস আহমেদ আরও জানান, "বর্তমানে আসামের সাধারণ মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। আসামের বিভিন্ন প্রান্তসহ দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মুসলিম সমাজ নিজেদের তহবিল থেকে ত্রাণ নিয়ে আসামের দুর্গম এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছেন। এই মানবিক পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চক্রান্ত অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।"ত্রাণকাজে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবকরা জানান, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো ধর্মের বিচার করে আসে না। তাই ত্রাণ বিতরণও হওয়া উচিত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রয়োজনভিত্তিক। দুর্যোগের মুহূর্তে রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সবাই মিলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে কাজ করাই এখন একমাত্র অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।