বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

আসাম নির্বাচনে যোগীর ‘অনুপ্রবেশ’ কার্ড: সাম্প্রদায়িক ও নাগরিক অধিকারের সংকট

ভারতের আসাম রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে উঠেছে। গত শুক্রবার রাজ্যের বরপেটা ও বরচল্লায় আয়োজিত বিশাল নির্বাচনী জনসভায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অনুপ্রবেশ ইস্যুকে হাতিয়ার করে বিরোধী শিবিরের বিরুদ্ধে কঠোর বিষোদগার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, একমাত্র বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারই আসামের ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ এবং ‘জনমিতিক সুরক্ষা’ নিশ্চিত করতে সক্ষম।নির্বাচনী প্রচারণায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ কংগ্রেস ও অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (AIUDF) আসামের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “কংগ্রেস দীর্ঘ ৬০ বছর ক্ষমতায় থাকলেও তারা কেবল অনুপ্রবেশ, সহিংসতা ও দাঙ্গাকে প্রশ্রয় দিয়েছে।” বিজেপি নেতাদের দাবি অনুযায়ী, আসামে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বহিরাগতদের প্রবেশ স্থানীয় সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।যোগী আদিত্যনাথ তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “একমাত্র এনডিএ সরকারই আসামকে অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে মুক্ত করতে পারে এবং রাজ্যের জনমিতি (Demography) পরিবর্তন হওয়া রোধ করতে পারে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিরোধী দলগুলো পরিকল্পিতভাবে রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচয় বিকৃত করার চেষ্টা করছে। এ সময় তিনি ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে অযোধ্যার রাম মন্দির এবং কামাখ্যা করিডোরের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।আগামী ৯ এপ্রিল আসামের ১২৬টি বিধানসভা আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পুনরায় ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটিকে সামনে আনা হয়েছে। আদিত্যনাথের এই বক্তব্যে আসামের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বরপেটার মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এমন বক্তব্যকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।ঐতিহাসিকভাবে, আসামে এনআরসি (NRC) এবং ডি-ভোটার (D-Voter) ইস্যুকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। যোগী আদিত্যনাথের এবারের বক্তব্যে ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটির ঢালাও ব্যবহার মূলত প্রান্তিক মুসলিমদের লক্ষ্য করে করা হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতিগত বিভেদকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় মুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদার ওপর।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী প্রচারণায় নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে তকমা দেওয়া মৌলিক মানবাধিকার ও সংবিধানিক সাম্যের পরিপন্থী। ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ এবং ২১ নাগরিকের মর্যাদা ও জীবনের অধিকার নিশ্চিত করলেও, বারবার রাজনৈতিক স্বার্থে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, আসামের মুসলিমরা কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করলেও তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা দীর্ঘদিনের। দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এটি স্পষ্ট যে, জাতীয় ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব। কোনো প্রমাণ ছাড়াই একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে জনমিতি পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত করা স্বচ্ছ তদন্তর ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আসাম নির্বাচনে যোগীর ‘অনুপ্রবেশ’ কার্ড: সাম্প্রদায়িক ও নাগরিক অধিকারের সংকট