ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্রতর হচ্ছে। আগামী ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচারণার সময় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘মিয়া’ বা বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের লক্ষ্য করে তার সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তার নির্বাচনী জনসভায় কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। সরকারের দাবি অনুযায়ী, আসামের ‘ভূমিপুত্র’ বা আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীরা আসামের জমি ও ঘরবাড়ি দখল করে নিয়েছে।
দাকুয়াখানার এক জনসভায় তিনি বলেন:
“যারা বাংলাদেশ থেকে এসে আসামের জমি ও ঘরবাড়ি দখল করেছে, আমরা রাজনৈতিকভাবে তাদের হাত-পা ভেঙে দিয়েছি। এবার আমরা এই ‘মিয়াদের’ মেরুদণ্ড ভেঙে দেব, যাতে তারা অসমীয়া মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সাহস না পায়।”
সরকারি পক্ষের দাবি, গত পাঁচ বছরে তারা ১.৫ লক্ষ বিঘা জমি ‘উচ্ছেদ’ করেছেন যা তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের দখলে ছিল। তাদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ।
ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) আসামের লখিমপুর জেলার দাকুয়াখানায় একটি নির্বাচনী প্রচারণার সময়। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সরাসরি ‘মিয়া’ (Miya) শব্দটি ব্যবহার করে এই হুমকি দেন। আসামে ‘মিয়া’ শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে একটি সম্মানসূচক শব্দ হলেও বর্তমানে তা বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের প্রতি অবমাননাকর গালি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মুসলিমদের ওপর প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি:
বাস্তবতা হলো, আসামের এই মুসলিম জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে হওয়া এনআরসি (NRC) প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়েছে যে, কথিত ‘কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী’র দাবিটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গৌহাটি হাইকোর্ট ঘৃণা ভাষণের অভিযোগে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে আনা পিটিশনের প্রেক্ষিতে জবাব তলব করেছে। ভারতীয় দণ্ডবিধি এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, জনপ্রতিনিধিদের এমন বক্তব্য সরাসরি আইন লঙ্ঘন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য বা সহিংসতা উস্কে দিতে পারে না।
জমি উচ্ছেদের নামে হাজার হাজার মানুষকে খোলা আকাশের নিচে ছুড়ে ফেলা অমানবিক। উপযুক্ত পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।
আসামের এই পরিস্থিতি কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম উম্মাহর ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নের একটি অংশ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে ‘মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার’ মতো সহিংস ভাষা কেবল নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী নয়, বরং তা মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা। বিশ্ব সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উচিত আসামের সংখ্যালঘু মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করা। স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা সম্ভব।

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্রতর হচ্ছে। আগামী ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচারণার সময় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘মিয়া’ বা বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের লক্ষ্য করে তার সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তার নির্বাচনী জনসভায় কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। সরকারের দাবি অনুযায়ী, আসামের ‘ভূমিপুত্র’ বা আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীরা আসামের জমি ও ঘরবাড়ি দখল করে নিয়েছে।
দাকুয়াখানার এক জনসভায় তিনি বলেন:
“যারা বাংলাদেশ থেকে এসে আসামের জমি ও ঘরবাড়ি দখল করেছে, আমরা রাজনৈতিকভাবে তাদের হাত-পা ভেঙে দিয়েছি। এবার আমরা এই ‘মিয়াদের’ মেরুদণ্ড ভেঙে দেব, যাতে তারা অসমীয়া মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সাহস না পায়।”
সরকারি পক্ষের দাবি, গত পাঁচ বছরে তারা ১.৫ লক্ষ বিঘা জমি ‘উচ্ছেদ’ করেছেন যা তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের দখলে ছিল। তাদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ।
ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) আসামের লখিমপুর জেলার দাকুয়াখানায় একটি নির্বাচনী প্রচারণার সময়। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সরাসরি ‘মিয়া’ (Miya) শব্দটি ব্যবহার করে এই হুমকি দেন। আসামে ‘মিয়া’ শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে একটি সম্মানসূচক শব্দ হলেও বর্তমানে তা বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের প্রতি অবমাননাকর গালি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মুসলিমদের ওপর প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি:
বাস্তবতা হলো, আসামের এই মুসলিম জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করে আসছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে হওয়া এনআরসি (NRC) প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়েছে যে, কথিত ‘কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী’র দাবিটি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গৌহাটি হাইকোর্ট ঘৃণা ভাষণের অভিযোগে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে আনা পিটিশনের প্রেক্ষিতে জবাব তলব করেছে। ভারতীয় দণ্ডবিধি এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, জনপ্রতিনিধিদের এমন বক্তব্য সরাসরি আইন লঙ্ঘন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য বা সহিংসতা উস্কে দিতে পারে না।
জমি উচ্ছেদের নামে হাজার হাজার মানুষকে খোলা আকাশের নিচে ছুড়ে ফেলা অমানবিক। উপযুক্ত পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী।
আসামের এই পরিস্থিতি কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম উম্মাহর ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নের একটি অংশ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে ‘মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার’ মতো সহিংস ভাষা কেবল নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী নয়, বরং তা মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা। বিশ্ব সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উচিত আসামের সংখ্যালঘু মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করা। স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন