অস্ট্রিয়ার সংসদ দেশটির স্কুলগুলোতে ১৪ বছরের নিচে শিশুদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে। এই সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার নীতির পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছে মুসলিম সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যে আইনটি সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা এসেছে। বিষয়টি ইউরোপজুড়ে মুসলিমবিদ্বেষ ও রাষ্ট্রীয় নীতির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
অস্ট্রিয়ার জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল কাউন্সিল) ১৪ বছরের নিচে শিশুদের স্কুলে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে একটি বিল অনুমোদন করেছে। গ্রিন পার্টি ছাড়া সংসদের অন্যান্য সব দল বিলটির পক্ষে ভোট দেয়। আইন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিশুদের অভিভাবকদের ১৫০ থেকে ৮০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। ২০২৬–২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই শাস্তিমূলক বিধান কার্যকর করার পথও খুলে দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে অস্ট্রিয়া ইসলামিক কমিউনিটি (IGGÖ)। এক লিখিত বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, তারা যে কোনো ধরনের জোরপূর্বক ধর্মীয় আচরণ প্রত্যাখ্যান করে, তবে যারা নিজ বিশ্বাস থেকে স্বেচ্ছায় হিজাব পরতে চায়—সেই শিশুদের অধিকার রক্ষাও সমানভাবে জরুরি। IGGÖ-এর মতে, সাধারণ নিষেধাজ্ঞা মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে এবং এতে স্বেচ্ছায় ধর্মীয় অনুশীলনকারী শিশুরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংগঠনটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আইনের সাংবিধানিকতা ও মানবাধিকারসংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগের কারণে তারা বিষয়টি সাংবিধানিক আদালতে নিয়ে যাবে। IGGÖ সভাপতি উমিত ভুরাল বলেন, অস্ট্রিয়ার আইনে ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ধর্ম; ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে—এমন যেকোনো আইন সাংবিধানিকভাবে যাচাই করানো তাদের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, “শিশুদের প্রতীকী রাজনীতির নয়, বরং সুরক্ষা, শিক্ষা ও সচেতনতার প্রয়োজন। আমরা জোরপূর্বক আচরণ প্রত্যাখ্যান করি, কিন্তু স্বাধীনতাকে সমর্থন করি—প্রতিটি শিশুর জন্য।”
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রিয়া এই সিদ্ধান্তকে “বেদনাদায়ক” বলে অভিহিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, তাদের সতর্কতা উপেক্ষা করেই সংসদ একটি বৈষম্যমূলক হিজাব নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছে, যা সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সমালোচনা এসেছে রাজনৈতিক মহল থেকেও। ভিয়েনার ১০ম জেলার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টির (SPÖ) কাউন্সিলর মুহাম্মদ ইউকসেক বলেন, এই আইন মুসলিমবিদ্বেষকে স্বাভাবিক করে তুলছে এবং ভবিষ্যতে বর্ণবাদী হামলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তার ভাষায়, এটি শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করছে না, বরং মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে একটি রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আজ যে বৈষম্য কথাবার্তায় শুরু হচ্ছে, কাল তা রাস্তায় হামলায় রূপ নিতে পারে—ইউরোপের অতীত অভিজ্ঞতা সেটাই প্রমাণ করে।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, অস্ট্রিয়ায় এর আগেও এমন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য হিজাব নিষিদ্ধ করা হলে, ২০২০ সালের ১১ ডিসেম্বর দেশটির সাংবিধানিক আদালত সেই আইন বাতিল করে দেয়। আদালত রায়ে বলেছিল, ওই নিষেধাজ্ঞা সমতার নীতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের আগে পরিবার, সমন্বয় ও ইউরোপ বিষয়ক মন্ত্রী ক্লাউডিয়া প্লাকলম দাবি করেছিলেন, হিজাব একটি “চাপের প্রতীক”, যেখানে কিপা বা ক্রসকে তিনি সে রকম প্রতীক হিসেবে দেখেন না। তবে সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি নিজেই ধর্মীয় সমতার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিষয় : ইসলামফোবিয়া অস্ট্রিয়া

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
অস্ট্রিয়ার সংসদ দেশটির স্কুলগুলোতে ১৪ বছরের নিচে শিশুদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে। এই সিদ্ধান্তকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার নীতির পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছে মুসলিম সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যে আইনটি সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা এসেছে। বিষয়টি ইউরোপজুড়ে মুসলিমবিদ্বেষ ও রাষ্ট্রীয় নীতির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
অস্ট্রিয়ার জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল কাউন্সিল) ১৪ বছরের নিচে শিশুদের স্কুলে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে একটি বিল অনুমোদন করেছে। গ্রিন পার্টি ছাড়া সংসদের অন্যান্য সব দল বিলটির পক্ষে ভোট দেয়। আইন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিশুদের অভিভাবকদের ১৫০ থেকে ৮০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। ২০২৬–২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই শাস্তিমূলক বিধান কার্যকর করার পথও খুলে দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে অস্ট্রিয়া ইসলামিক কমিউনিটি (IGGÖ)। এক লিখিত বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, তারা যে কোনো ধরনের জোরপূর্বক ধর্মীয় আচরণ প্রত্যাখ্যান করে, তবে যারা নিজ বিশ্বাস থেকে স্বেচ্ছায় হিজাব পরতে চায়—সেই শিশুদের অধিকার রক্ষাও সমানভাবে জরুরি। IGGÖ-এর মতে, সাধারণ নিষেধাজ্ঞা মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে এবং এতে স্বেচ্ছায় ধর্মীয় অনুশীলনকারী শিশুরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংগঠনটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আইনের সাংবিধানিকতা ও মানবাধিকারসংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগের কারণে তারা বিষয়টি সাংবিধানিক আদালতে নিয়ে যাবে। IGGÖ সভাপতি উমিত ভুরাল বলেন, অস্ট্রিয়ার আইনে ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত ধর্ম; ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে—এমন যেকোনো আইন সাংবিধানিকভাবে যাচাই করানো তাদের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, “শিশুদের প্রতীকী রাজনীতির নয়, বরং সুরক্ষা, শিক্ষা ও সচেতনতার প্রয়োজন। আমরা জোরপূর্বক আচরণ প্রত্যাখ্যান করি, কিন্তু স্বাধীনতাকে সমর্থন করি—প্রতিটি শিশুর জন্য।”
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রিয়া এই সিদ্ধান্তকে “বেদনাদায়ক” বলে অভিহিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, তাদের সতর্কতা উপেক্ষা করেই সংসদ একটি বৈষম্যমূলক হিজাব নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছে, যা সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সমালোচনা এসেছে রাজনৈতিক মহল থেকেও। ভিয়েনার ১০ম জেলার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টির (SPÖ) কাউন্সিলর মুহাম্মদ ইউকসেক বলেন, এই আইন মুসলিমবিদ্বেষকে স্বাভাবিক করে তুলছে এবং ভবিষ্যতে বর্ণবাদী হামলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তার ভাষায়, এটি শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করছে না, বরং মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে একটি রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আজ যে বৈষম্য কথাবার্তায় শুরু হচ্ছে, কাল তা রাস্তায় হামলায় রূপ নিতে পারে—ইউরোপের অতীত অভিজ্ঞতা সেটাই প্রমাণ করে।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, অস্ট্রিয়ায় এর আগেও এমন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য হিজাব নিষিদ্ধ করা হলে, ২০২০ সালের ১১ ডিসেম্বর দেশটির সাংবিধানিক আদালত সেই আইন বাতিল করে দেয়। আদালত রায়ে বলেছিল, ওই নিষেধাজ্ঞা সমতার নীতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের আগে পরিবার, সমন্বয় ও ইউরোপ বিষয়ক মন্ত্রী ক্লাউডিয়া প্লাকলম দাবি করেছিলেন, হিজাব একটি “চাপের প্রতীক”, যেখানে কিপা বা ক্রসকে তিনি সে রকম প্রতীক হিসেবে দেখেন না। তবে সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি নিজেই ধর্মীয় সমতার নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আপনার মতামত লিখুন