ভারতের মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ১৬৭ জন মুসলিম শিশুকে আটক করেছে রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী (আরপিএফ)। মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিহার ও মহারাষ্ট্র থেকে আসার পথে 'পাচারের' সন্দেহ তুলে তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়। রমজান পরবর্তী নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিশুদের এমন গণহারে আটকে রাখার ঘটনায় প্রশাসনিক উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনীর (আরপিএফ) কর্মকর্তাদের দাবি, গত ১১ এপ্রিল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা এই অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের অভিযোগ, বিহার ও মহারাষ্ট্র থেকে আসা এই শিশুদের অনেকের কাছেই অভিভাবকের সঠিক অনুমতিপত্র বা বৈধ কাগজপত্র ছিল না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, "প্রাথমিক তদন্তে মানবপাচারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তাই সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।" তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, শিশুরা কোথায় এবং কেন যাচ্ছে, সে বিষয়ে আয়োজকদের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। সাদ্দাম নামক এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে পুলিশ জানিয়েছে, তিনি এই স্থানান্তরের নেপথ্যে ছিলেন এবং তার দাবিগুলো বর্তমানে যাচাই করা হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ১১ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশনে। বিহার ও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৬৭ জন শিশু ট্রেনে করে মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল। উল্লেখ্য, ভারতে পবিত্র রমজান মাসের ছুটির পর শাওয়াল মাস থেকেই কওমি মাদরাসাগুলোর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। প্রতি বছরই এই সময়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে জ্ঞান অর্জনের জন্য ভ্রমণ করে।
ভুক্তভোগী শিশুরা জানিয়েছে, তারা মূলত দ্বীনি শিক্ষার উদ্দেশ্যেই যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আরপিএফের আচমকা অভিযানে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে এই ১৬৭ শিশুকে বিভিন্ন শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের হেফাজতে রাখা হয়েছে। মুসলিম সমাজ ও নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, প্রতি বছরই স্বাভাবিক নিয়মে শিক্ষার্থীরা আসা-যাওয়া করলেও এবার হঠাৎ পাচারের তকমা দিয়ে তাদের আটক করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অভিভাবক ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, "যদি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা কাগজের অভাব থাকে, তবে তা সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে শিশুদের অপরাধীর মতো আটক করা চরম অমানবিক।" এই পদক্ষেপটি ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পথে অন্তরায় ও প্রশাসনিক হয়রানি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং ভারতের সংবিধানের ২১ ও ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষা ও নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস পালনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কেবল 'সন্দেহের' বশবর্তী হয়ে ১৬৭ জন শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আটকে রাখা আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যদি মানবপাচারের প্রকৃত কোনো ঝুঁকি না থাকে, তবে এভাবে শিশুদের হয়রানি করা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
তদন্তের স্বার্থে যাচাই-বাছাই চলতেই পারে, তবে তা যেন কোনো বিশেষ অংশকে লক্ষ্যবস্তু করার হাতিয়ার না হয়। এখানে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধ শিশুদের অবিলম্বে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া বা গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। শিক্ষার অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে শিশুদের সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে 'সন্দেহের' নামে কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার না হয়।
বিষয় : ভারত

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬
ভারতের মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন থেকে ১৬৭ জন মুসলিম শিশুকে আটক করেছে রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী (আরপিএফ)। মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিহার ও মহারাষ্ট্র থেকে আসার পথে 'পাচারের' সন্দেহ তুলে তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়। রমজান পরবর্তী নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিশুদের এমন গণহারে আটকে রাখার ঘটনায় প্রশাসনিক উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনীর (আরপিএফ) কর্মকর্তাদের দাবি, গত ১১ এপ্রিল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা এই অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের অভিযোগ, বিহার ও মহারাষ্ট্র থেকে আসা এই শিশুদের অনেকের কাছেই অভিভাবকের সঠিক অনুমতিপত্র বা বৈধ কাগজপত্র ছিল না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, "প্রাথমিক তদন্তে মানবপাচারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তাই সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।" তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, শিশুরা কোথায় এবং কেন যাচ্ছে, সে বিষয়ে আয়োজকদের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। সাদ্দাম নামক এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে পুলিশ জানিয়েছে, তিনি এই স্থানান্তরের নেপথ্যে ছিলেন এবং তার দাবিগুলো বর্তমানে যাচাই করা হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ১১ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশনে। বিহার ও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৬৭ জন শিশু ট্রেনে করে মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল। উল্লেখ্য, ভারতে পবিত্র রমজান মাসের ছুটির পর শাওয়াল মাস থেকেই কওমি মাদরাসাগুলোর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। প্রতি বছরই এই সময়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে জ্ঞান অর্জনের জন্য ভ্রমণ করে।
ভুক্তভোগী শিশুরা জানিয়েছে, তারা মূলত দ্বীনি শিক্ষার উদ্দেশ্যেই যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আরপিএফের আচমকা অভিযানে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে এই ১৬৭ শিশুকে বিভিন্ন শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের হেফাজতে রাখা হয়েছে। মুসলিম সমাজ ও নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, প্রতি বছরই স্বাভাবিক নিয়মে শিক্ষার্থীরা আসা-যাওয়া করলেও এবার হঠাৎ পাচারের তকমা দিয়ে তাদের আটক করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অভিভাবক ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, "যদি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা কাগজের অভাব থাকে, তবে তা সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে শিশুদের অপরাধীর মতো আটক করা চরম অমানবিক।" এই পদক্ষেপটি ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পথে অন্তরায় ও প্রশাসনিক হয়রানি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং ভারতের সংবিধানের ২১ ও ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষা ও নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস পালনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কেবল 'সন্দেহের' বশবর্তী হয়ে ১৬৭ জন শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আটকে রাখা আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যদি মানবপাচারের প্রকৃত কোনো ঝুঁকি না থাকে, তবে এভাবে শিশুদের হয়রানি করা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
তদন্তের স্বার্থে যাচাই-বাছাই চলতেই পারে, তবে তা যেন কোনো বিশেষ অংশকে লক্ষ্যবস্তু করার হাতিয়ার না হয়। এখানে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধ শিশুদের অবিলম্বে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া বা গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। শিক্ষার অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে শিশুদের সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে 'সন্দেহের' নামে কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার না হয়।

আপনার মতামত লিখুন