শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ‘উড়া দু কেয়া’ ভিডিও; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুসলিমবিদ্বেষ ও নিরাপত্তার সংকট

ভারতে হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করে ‘হত্যার হুমকি’: উগ্রবাদী নেত্রীর



ভারতে হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করে ‘হত্যার হুমকি’: উগ্রবাদী নেত্রীর

ভারতের উত্তরপ্রদেশে বোরকা ও নেকাব পরিহিতা এক মুসলিম নারীকে অলক্ষ্যে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উস্কানিমূলক প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত হিন্দুত্ববাদী নারী মুসকান সিং ভিডিওর ক্যাপশনে ‘উড়িয়ে দেব নাকি?’ লিখে প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই ঘটনাটি ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ঘৃণা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার এক নতুন নজির স্থাপন করেছে।

অভিযুক্ত মুসকান সিং উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের বাসিন্দা। তিনি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে বোরকা পরিহিতা এক অপরিচিত মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করে দুটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেন। ভিডিওতে তিনি সরাসরি ওই নারীর দিকে ইঙ্গিত করে ক্যাপশনে লেখেন, “উড়া দু কেয়া” (উড়িয়ে দেব নাকি?)। এর সাথে যুক্ত করা হয় হাসির ইমোজি এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান।

পরবর্তী একটি ক্লিপে তিনি ক্যাপশন দেন, “কিছু কি লক্ষ্য করেছেন? জয় ভবানী”। ভিডিওতে ব্যবহৃত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটি ছিল চরম উস্কানিমূলক একটি গান, যার কথাগুলো ছিল এমন— “আমি দুনিয়ার রাজা। সিকিউরিটির মধ্যে থেকেও তোকে বাঁচানো যাবে না। মনে রাখিস, আমি তোকে বলেই মারব। তোর ঘরে ঢুকে গুলি চালাব।” এই ধরণের গান ও ক্যাপশন সাধারণত উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতে এবং অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে ব্যবহার করে থাকে।

ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের লখনউ শহরে ঘটেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন মুসলিম নারী নেকাব পরিহিত অবস্থায় তার নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন যে, পাশে থাকা অন্য এক নারী তাকে লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক ভিডিও ধারণ করছেন এবং অনলাইনে তার জীবনের ওপর হুমকি প্রদান করছেন।

ভুক্তভোগী নারীর পরিচয় গোপন থাকলেও, এই ঘটনার প্রভাব ভারতের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম নারীরা যারা ধর্মীয় পোশাক পরিধান করেন, তারা ঘরের বাইরে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্রমাগত টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হিজাব ও বোরকা পরিহিত নারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক হেনস্তার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই ঘটনায় সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিতপূর্ণ গান ব্যবহার করায় স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের নিজস্ব সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ভিডিও ধারণ করা এবং সেখানে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া কেবল সাইবার অপরাধ নয়, বরং এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এভাবে মুসলিমবিদ্বেষ বা 'ইসলামোফোবিয়া' ছড়িয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এই ধরণের উগ্রবাদী সংস্কৃতি আরও ডালপালা মেলবে। ভারতের তথ্য প্রযুক্তি আইন (IT Act) এবং দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারা অনুযায়ী ঘৃণ্য বক্তব্য বা ‘হেট স্পিচ’ প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এই ধরণের উস্কানিদাতাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা না হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের দাবি।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


ভারতে হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করে ‘হত্যার হুমকি’: উগ্রবাদী নেত্রীর

প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরপ্রদেশে বোরকা ও নেকাব পরিহিতা এক মুসলিম নারীকে অলক্ষ্যে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উস্কানিমূলক প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত হিন্দুত্ববাদী নারী মুসকান সিং ভিডিওর ক্যাপশনে ‘উড়িয়ে দেব নাকি?’ লিখে প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই ঘটনাটি ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ঘৃণা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার এক নতুন নজির স্থাপন করেছে।

অভিযুক্ত মুসকান সিং উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের বাসিন্দা। তিনি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে বোরকা পরিহিতা এক অপরিচিত মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করে দুটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেন। ভিডিওতে তিনি সরাসরি ওই নারীর দিকে ইঙ্গিত করে ক্যাপশনে লেখেন, “উড়া দু কেয়া” (উড়িয়ে দেব নাকি?)। এর সাথে যুক্ত করা হয় হাসির ইমোজি এবং ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান।

পরবর্তী একটি ক্লিপে তিনি ক্যাপশন দেন, “কিছু কি লক্ষ্য করেছেন? জয় ভবানী”। ভিডিওতে ব্যবহৃত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটি ছিল চরম উস্কানিমূলক একটি গান, যার কথাগুলো ছিল এমন— “আমি দুনিয়ার রাজা। সিকিউরিটির মধ্যে থেকেও তোকে বাঁচানো যাবে না। মনে রাখিস, আমি তোকে বলেই মারব। তোর ঘরে ঢুকে গুলি চালাব।” এই ধরণের গান ও ক্যাপশন সাধারণত উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতে এবং অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে ব্যবহার করে থাকে।

ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের লখনউ শহরে ঘটেছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন মুসলিম নারী নেকাব পরিহিত অবস্থায় তার নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন যে, পাশে থাকা অন্য এক নারী তাকে লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক ভিডিও ধারণ করছেন এবং অনলাইনে তার জীবনের ওপর হুমকি প্রদান করছেন।

ভুক্তভোগী নারীর পরিচয় গোপন থাকলেও, এই ঘটনার প্রভাব ভারতের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম নারীরা যারা ধর্মীয় পোশাক পরিধান করেন, তারা ঘরের বাইরে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্রমাগত টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হিজাব ও বোরকা পরিহিত নারীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক হেনস্তার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই ঘটনায় সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিতপূর্ণ গান ব্যবহার করায় স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের নিজস্ব সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ভিডিও ধারণ করা এবং সেখানে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া কেবল সাইবার অপরাধ নয়, বরং এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এভাবে মুসলিমবিদ্বেষ বা 'ইসলামোফোবিয়া' ছড়িয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এই ধরণের উগ্রবাদী সংস্কৃতি আরও ডালপালা মেলবে। ভারতের তথ্য প্রযুক্তি আইন (IT Act) এবং দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারা অনুযায়ী ঘৃণ্য বক্তব্য বা ‘হেট স্পিচ’ প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এই ধরণের উস্কানিদাতাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা না হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের দাবি।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত