মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

ঘৃণার রাজনীতির বিপরীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অকৃত্রিম বন্ধুত্বের অনন্য নজির গড়লেন শেখু নগরের ইশহাক খান

উত্তরপ্রদেশে মুমূর্ষু হিন্দু বৃদ্ধকে কোলে তুলে হাসপাতালে নিলেন মুসলিম বন্ধু


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬

উত্তরপ্রদেশে মুমূর্ষু হিন্দু বৃদ্ধকে কোলে তুলে হাসপাতালে নিলেন মুসলিম বন্ধু

ভারতের উত্তরপ্রদেশে যখন ধর্মীয় মেরুকরণ ও বিদ্বেষী প্রচারণার খবর প্রায়শই শিরোনাম হয়, তখন মহোবা জেলা থেকে উঠে এসেছে এক হৃদয়স্পর্শী চিত্র। রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ৮৬ বছর বয়সী এক হিন্দু বৃদ্ধকে যখন সাধারণ মানুষ এড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন দেবদূতের মতো এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন তার দীর্ঘদিনের মুসলিম বন্ধু। এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃত মানবিকতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।

সমকালীন ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দেওয়া একটি প্রচলিত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডায় দাবি করা হয় যে, মুসলিমদের সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিমদের 'অবিশ্বস্ত' হিসেবে চিত্রায়িত করে তাদের এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। মহোবার এই ঘটনায় দেখা যায়, বৃদ্ধ মুরলীধর তিওয়ারি যখন রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত পথচারীদের বিশাল অংশ কেবল দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। এই নীরবতা বা উদাসীনতাকে সমালোচকরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে দাবি করলেও, এর পেছনে আইনি ঝামেলা বা সাম্প্রদায়িক ভীতির মতো পরোক্ষ প্রভাবও কাজ করে থাকতে পারে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই একতরফাভাবে মুসলিমদের দোষারোপ করার প্রবণতা থাকলেও, এই ঘটনায় সাহায্যের হাত প্রসারিত করার ক্ষেত্রে সেই 'ভয়ের রাজনীতি' পরাস্ত হয়েছে।

ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের মহোবা জেলার শেখু নগর মহল্লার। ৮৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ মুরলীধর তিওয়ারি বাড়ির বাইরে প্রয়োজনীয় কাজে বের হলে রাস্তার একটি কাঁচের টুকরো তার পায়ে বিঁধে যায়। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, অনেক মানুষ সেখানে ভিড় করলেও কেউ তাকে স্পর্শ করেনি বা হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি।

খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান তার প্রতিবেশী এবং দীর্ঘ ১০ বছরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইশহাক খান। তিনি কোনো কালক্ষেপণ না করে অচেতন বৃদ্ধকে নিজের কোলে তুলে নেন। এরপর একজন স্থানীয় তরুণের সহায়তায় মোটরসাইকেলে করে তাকে জেলা হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নিয়ে যান। হাসপাতালে ভর্তির পর ইশহাক খান কেবল বসেই থাকেননি, বরং নিজ হাতে বন্ধুর ড্রেসিং ও প্রাথমিক শুশ্রূষা করেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে বৃদ্ধের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হতে পারত। ইশহাক খান ও মুরলীধর তিওয়ারি গত এক দশক ধরে প্রতিবেশী হিসেবে বাস করছেন এবং ঈদ-দিওয়ালির মতো উৎসবে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে আনন্দ ভাগ করে নেন।

এই ঘটনাটি কেবল একটি বন্ধুত্বের গল্প নয়, বরং এটি মানবাধিকার ও নাগরিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেও মানুষের বিপদে সহায়তা করাকে মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবেশীর হক এবং আর্তমানবতার সেবা একটি অপরিহার্য ইবাদত। ইশহাক খান তার বক্তব্যে বর্তমান সমাজের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আসল পরিচয় সেই মানুষের, যে বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায়।" এখানে প্রশ্ন ওঠে—যারা মুসলিমদের বয়কট বা ঘৃণা ছড়ানোর রাজনীতি করে, তারা কি মুরলীধর তিওয়ারির মতো নিরুপায় মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবে? এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে সামাজিক সংহতির কোনো বিকল্প নেই। দায়বদ্ধতা ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে এই ধরনের সম্প্রীতি কেবল অনুকরণীয়ই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে প্রশংসার দাবিদার।

বিষয় : ভারত

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


উত্তরপ্রদেশে মুমূর্ষু হিন্দু বৃদ্ধকে কোলে তুলে হাসপাতালে নিলেন মুসলিম বন্ধু

প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরপ্রদেশে যখন ধর্মীয় মেরুকরণ ও বিদ্বেষী প্রচারণার খবর প্রায়শই শিরোনাম হয়, তখন মহোবা জেলা থেকে উঠে এসেছে এক হৃদয়স্পর্শী চিত্র। রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ৮৬ বছর বয়সী এক হিন্দু বৃদ্ধকে যখন সাধারণ মানুষ এড়িয়ে যাচ্ছিল, তখন দেবদূতের মতো এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন তার দীর্ঘদিনের মুসলিম বন্ধু। এই ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃত মানবিকতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।

সমকালীন ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দেওয়া একটি প্রচলিত প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডায় দাবি করা হয় যে, মুসলিমদের সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিমদের 'অবিশ্বস্ত' হিসেবে চিত্রায়িত করে তাদের এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। মহোবার এই ঘটনায় দেখা যায়, বৃদ্ধ মুরলীধর তিওয়ারি যখন রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত পথচারীদের বিশাল অংশ কেবল দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। এই নীরবতা বা উদাসীনতাকে সমালোচকরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে দাবি করলেও, এর পেছনে আইনি ঝামেলা বা সাম্প্রদায়িক ভীতির মতো পরোক্ষ প্রভাবও কাজ করে থাকতে পারে। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই একতরফাভাবে মুসলিমদের দোষারোপ করার প্রবণতা থাকলেও, এই ঘটনায় সাহায্যের হাত প্রসারিত করার ক্ষেত্রে সেই 'ভয়ের রাজনীতি' পরাস্ত হয়েছে।

ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের মহোবা জেলার শেখু নগর মহল্লার। ৮৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ মুরলীধর তিওয়ারি বাড়ির বাইরে প্রয়োজনীয় কাজে বের হলে রাস্তার একটি কাঁচের টুকরো তার পায়ে বিঁধে যায়। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, অনেক মানুষ সেখানে ভিড় করলেও কেউ তাকে স্পর্শ করেনি বা হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি।

খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান তার প্রতিবেশী এবং দীর্ঘ ১০ বছরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইশহাক খান। তিনি কোনো কালক্ষেপণ না করে অচেতন বৃদ্ধকে নিজের কোলে তুলে নেন। এরপর একজন স্থানীয় তরুণের সহায়তায় মোটরসাইকেলে করে তাকে জেলা হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নিয়ে যান। হাসপাতালে ভর্তির পর ইশহাক খান কেবল বসেই থাকেননি, বরং নিজ হাতে বন্ধুর ড্রেসিং ও প্রাথমিক শুশ্রূষা করেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে বৃদ্ধের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হতে পারত। ইশহাক খান ও মুরলীধর তিওয়ারি গত এক দশক ধরে প্রতিবেশী হিসেবে বাস করছেন এবং ঈদ-দিওয়ালির মতো উৎসবে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে আনন্দ ভাগ করে নেন।

এই ঘটনাটি কেবল একটি বন্ধুত্বের গল্প নয়, বরং এটি মানবাধিকার ও নাগরিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেও মানুষের বিপদে সহায়তা করাকে মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবেশীর হক এবং আর্তমানবতার সেবা একটি অপরিহার্য ইবাদত। ইশহাক খান তার বক্তব্যে বর্তমান সমাজের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আসল পরিচয় সেই মানুষের, যে বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায়।" এখানে প্রশ্ন ওঠে—যারা মুসলিমদের বয়কট বা ঘৃণা ছড়ানোর রাজনীতি করে, তারা কি মুরলীধর তিওয়ারির মতো নিরুপায় মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবে? এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে সামাজিক সংহতির কোনো বিকল্প নেই। দায়বদ্ধতা ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে এই ধরনের সম্প্রীতি কেবল অনুকরণীয়ই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে প্রশংসার দাবিদার।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ