শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

ঐতিহাসিক তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণে মুসলিম পক্ষের জোরালো যুক্তি; আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড়

ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ বিতর্ক: মন্দির ধ্বংসের কোনো প্রমাণ নেই বলে হাইকোর্টে সওয়াল



ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ বিতর্ক: মন্দির ধ্বংসের কোনো প্রমাণ নেই বলে হাইকোর্টে সওয়াল

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধর জেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্স নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে শুনানির সময় মুসলিম পক্ষের আইনজীবীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো নির্দিষ্ট মন্দির ধ্বংস করে এই মসজিদ নির্মাণের সপক্ষে কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। প্রবীণ আইনজীবী সালমান খুরশিদ আদালতকে জানান, স্রেফ জনশ্রুতির ভিত্তিতে নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রমাণের ভিত্তিতেই এই বিবাদের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।

হিন্দু আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমান ভোজশালা কমপ্লেক্সটি মূলত ১০৩৪ সালে পারমার রাজবংশের রাজা ভোজ কর্তৃক নির্মিত একটি সরস্বতী মন্দির। তাদের দাবি অনুযায়ী, মুসলিম শাসনামলে এই মন্দিরটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এই দাবির সপক্ষে তারা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা একটি মূর্তিকে 'ভোজশালার বাগদেবী' বা সরস্বতী হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। এছাড়াও, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (ASI)-কে দিয়ে বৈজ্ঞানিক জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে তারা এই স্থাপনার 'আদি ধর্মীয় চরিত্র' প্রমাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। অভিযোগকারীদের বক্তব্য হলো, এই স্থানটি হিন্দুদের ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্তমানে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা এবং বিচারপতি অলক অবস্থির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছে। মাওলানা কামালউদ্দিন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী সালমান খুরশিদ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) আদালতে দীর্ঘ যুক্তি উপস্থাপন করেন।

ধ্বংসের প্রমাণের অভাব: খুরশিদ আদালতে বলেন, “কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট মন্দির ধ্বংস করে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নথিতে নেই।”

মূর্তি নিয়ে বিভ্রান্তি: ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত যে মূর্তিটিকে সরস্বতী হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, ২০০৩ সালের একটি কূটনৈতিক বার্তার বরাত দিয়ে খুরশিদ জানান, সেটি মূলত জৈন দেবী 'অম্বিকা'র মূর্তি। ফলে মন্দির ধ্বংসের মূল আর্গুমেন্টটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: তিনি ঐতিহাসিক আইন-উল-মুলক মুলতানির সময়কার বিবরণ তুলে ধরে জানান, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস নয়। সুফি সাধক কামালউদ্দিন চিশতির জীবনীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ, কোনো পরিকল্পিত ধর্মীয় উচ্ছেদ নয়।

এই আইনি লড়াইয়ের ফলে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভুতি এবং ইবাদতের অধিকার বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলমান এই বিবাদ কেবল একটি স্থাপনার মালিকানা নয়, বরং ভারতের মুসলিম ঐতিহ্যের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

এই মামলার বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সালমান খুরশিদ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক অযোধ্যা (বাবরি মসজিদ) রায়ের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি যুক্তি দেন যে, জমি বা স্থাপনার মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো কাল্পনিক আখ্যান বা ঐতিহাসিক বিবরণ নয়, বরং দেওয়ানী আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি ও দালিলিক প্রমাণাদিই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ ধর্মীয় পরিচয় ও স্থাপনা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। উপাসনালয় আইন (Places of Worship Act, 1991) অনুসারে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যে স্থাপনার যে ধর্মীয় চরিত্র ছিল, তা অপরিবর্তনীয় থাকার কথা। ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন আদালত কেবল আবেগের বশবর্তী না হয়ে নিরপেক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঐতিহ্যের সুরক্ষা এবং বিচারিক স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। আগামী সোমবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ বিতর্ক: মন্দির ধ্বংসের কোনো প্রমাণ নেই বলে হাইকোর্টে সওয়াল

প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধর জেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদ কমপ্লেক্স নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে শুনানির সময় মুসলিম পক্ষের আইনজীবীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো নির্দিষ্ট মন্দির ধ্বংস করে এই মসজিদ নির্মাণের সপক্ষে কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। প্রবীণ আইনজীবী সালমান খুরশিদ আদালতকে জানান, স্রেফ জনশ্রুতির ভিত্তিতে নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রমাণের ভিত্তিতেই এই বিবাদের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।

হিন্দু আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমান ভোজশালা কমপ্লেক্সটি মূলত ১০৩৪ সালে পারমার রাজবংশের রাজা ভোজ কর্তৃক নির্মিত একটি সরস্বতী মন্দির। তাদের দাবি অনুযায়ী, মুসলিম শাসনামলে এই মন্দিরটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এই দাবির সপক্ষে তারা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা একটি মূর্তিকে 'ভোজশালার বাগদেবী' বা সরস্বতী হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। এছাড়াও, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (ASI)-কে দিয়ে বৈজ্ঞানিক জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে তারা এই স্থাপনার 'আদি ধর্মীয় চরিত্র' প্রমাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। অভিযোগকারীদের বক্তব্য হলো, এই স্থানটি হিন্দুদের ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্তমানে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা এবং বিচারপতি অলক অবস্থির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলছে। মাওলানা কামালউদ্দিন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী সালমান খুরশিদ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) আদালতে দীর্ঘ যুক্তি উপস্থাপন করেন।

ধ্বংসের প্রমাণের অভাব: খুরশিদ আদালতে বলেন, “কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট মন্দির ধ্বংস করে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নথিতে নেই।”

মূর্তি নিয়ে বিভ্রান্তি: ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত যে মূর্তিটিকে সরস্বতী হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, ২০০৩ সালের একটি কূটনৈতিক বার্তার বরাত দিয়ে খুরশিদ জানান, সেটি মূলত জৈন দেবী 'অম্বিকা'র মূর্তি। ফলে মন্দির ধ্বংসের মূল আর্গুমেন্টটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: তিনি ঐতিহাসিক আইন-উল-মুলক মুলতানির সময়কার বিবরণ তুলে ধরে জানান, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস নয়। সুফি সাধক কামালউদ্দিন চিশতির জীবনীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ, কোনো পরিকল্পিত ধর্মীয় উচ্ছেদ নয়।

এই আইনি লড়াইয়ের ফলে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভুতি এবং ইবাদতের অধিকার বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলমান এই বিবাদ কেবল একটি স্থাপনার মালিকানা নয়, বরং ভারতের মুসলিম ঐতিহ্যের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

এই মামলার বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সালমান খুরশিদ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক অযোধ্যা (বাবরি মসজিদ) রায়ের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি যুক্তি দেন যে, জমি বা স্থাপনার মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো কাল্পনিক আখ্যান বা ঐতিহাসিক বিবরণ নয়, বরং দেওয়ানী আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি ও দালিলিক প্রমাণাদিই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ ধর্মীয় পরিচয় ও স্থাপনা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। উপাসনালয় আইন (Places of Worship Act, 1991) অনুসারে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যে স্থাপনার যে ধর্মীয় চরিত্র ছিল, তা অপরিবর্তনীয় থাকার কথা। ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন আদালত কেবল আবেগের বশবর্তী না হয়ে নিরপেক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঐতিহ্যের সুরক্ষা এবং বিচারিক স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। আগামী সোমবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত