বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

কালো কাঁচের আড়ালে মাত্র কয়েক মিনিটের অডিও আলাপ; সর্বোচ্চ নেতার অস্তিত্ব ও রহস্যময় নিখোঁজ থাকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে

স্পাই ফিল্মের দৃশ্যকেও হার মানালো: তেহরানে পেজেশকিয়ান ও মুজতবা খামেনির রহস্যময় গোপন বৈঠক



স্পাই ফিল্মের দৃশ্যকেও হার মানালো: তেহরানে পেজেশকিয়ান ও মুজতবা খামেনির রহস্যময় গোপন বৈঠক

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মুজতবা খামেনির মধ্যে একটি অত্যন্ত রহস্যময় ও নজিরবিহীন গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তেহরানের এক অজানা স্থানে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি অনেকটা স্পাই চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটকেও হার মানায়। একটি পুরো অন্ধকার গাড়িতে মাত্র কয়েক মিনিটের এই কথপোকথনে তারা একে অপরকে দেখতে পাননি বলে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

তেহরানের গোপন স্থানে নজিরবিহীন বৈঠক

ইরান ইন্টারন্যাশনাল সূত্রে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে নিরাপত্তার অজুহাতে তেহরানের একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে নিজের সরকারি গাড়ি থেকে নামিয়ে সম্পূর্ণ কালো কাঁচ দিয়ে ঘেরা একটি বাণিজ্যিক গাড়িতে বসানো হয়। গাড়িটির ভেতর এতটাই অন্ধকার রাখা হয়েছিল যে, পেজেশকিয়ান কিংবা তার মুখোমুখি বসা ব্যক্তি—কেউই একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলেন না।

এমনকি নিরাপত্তা প্রোটোকলের অজুহাতে পেজেশকিয়ানকে সর্বোচ্চ নেতার সাথে করমর্দন (হ্যান্ডশেক) করার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। পুরো বৈঠকটি কেবল অডিও বা কথার মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। এর পরপরই প্রেসিডেন্টকে স্থান ত্যাগ করতে বলা হয়।

প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ

এই গোপন বৈঠকের খবর ফাঁসের পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের আগের একটি বক্তব্যের সাথে বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মে মাসে এক বিবৃতিতে পেজেশকিয়ান দাবি করেছিলেন যে, তিনি মুজতবা খামেনির সাথে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত "আন্তরিক পরিবেশে" বৈঠক করেছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, মূল বৈঠকটি ছিল কয়েক মিনিটের এবং অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধরনের নিরাপত্তামূলক আচরণে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বৈঠকের পর নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সাথে আলোচনাকালে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, অন্ধকারে তিনি কেবল একটি কণ্ঠস্বর শুনেছেন, ফলে সেই ব্যক্তিটি সত্যিই মুজতবা খামেনি ছিলেন কি না তা নিয়ে তিনি সংশয়ী। পরবর্তীতে তিনি সর্বোচ্চ নেতার সরকারি বাসভবনে মুখোমুখি দ্বিতীয় বৈঠকের জন্য অনুরোধ জানালেও নিরাপত্তা পরিষদ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

রহস্যের নেপথ্যে: মুজতবা খামেনি কোথায়?

বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) কর্তৃক সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও মুজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার কোনো সাম্প্রতিক ভিডিও বা অডিও বার্তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়ায় দেশের ভেতরে ও বাইরে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোও তার এই আড়ালে থাকার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দৈনিক হামশাহরি-র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অডিও বা ভিডিও বার্তার ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দ, বৈদ্যুতিক গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি এবং কণ্ঠস্বরের রেজোন্যান্স বিশ্লেষণ করে সর্বোচ্চ নেতার সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা শনাক্ত করতে পারে। এ কারণেই মূলত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক গোপনীয়তা অবলম্বন করা হচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

মুজতবা খামেনির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বনেতাদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে:

যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, নতুন সর্বোচ্চ নেতার বেঁচে না থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ।

ইসরায়েল: অন্যদিকে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্র ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মুজতবা খামেনি জীবিত আছেন তবে তিনি অত্যন্ত গোপন আস্তানায় অবস্থান করছেন।

ইরানি প্রশাসন: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জুলাই মাসে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, "আমি এই মেয়াদের মধ্যে মুজতবা খামেনিকে সরাসরি দেখিনি; কেবল হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তা তার সংস্পর্শে যেতে পেরেছেন।"

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পশ্চিমা গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে ইরান তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে সুরক্ষায় নজিরবিহীন কৌশল গ্রহণ করেছে, যা একই সাথে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেও এক ধরনের ধোঁয়াশা ও সংশয় তৈরি করছে।

বিষয় : ইরান

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬


স্পাই ফিল্মের দৃশ্যকেও হার মানালো: তেহরানে পেজেশকিয়ান ও মুজতবা খামেনির রহস্যময় গোপন বৈঠক

প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মুজতবা খামেনির মধ্যে একটি অত্যন্ত রহস্যময় ও নজিরবিহীন গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তেহরানের এক অজানা স্থানে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি অনেকটা স্পাই চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটকেও হার মানায়। একটি পুরো অন্ধকার গাড়িতে মাত্র কয়েক মিনিটের এই কথপোকথনে তারা একে অপরকে দেখতে পাননি বলে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

তেহরানের গোপন স্থানে নজিরবিহীন বৈঠক

ইরান ইন্টারন্যাশনাল সূত্রে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে নিরাপত্তার অজুহাতে তেহরানের একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে নিজের সরকারি গাড়ি থেকে নামিয়ে সম্পূর্ণ কালো কাঁচ দিয়ে ঘেরা একটি বাণিজ্যিক গাড়িতে বসানো হয়। গাড়িটির ভেতর এতটাই অন্ধকার রাখা হয়েছিল যে, পেজেশকিয়ান কিংবা তার মুখোমুখি বসা ব্যক্তি—কেউই একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলেন না।

এমনকি নিরাপত্তা প্রোটোকলের অজুহাতে পেজেশকিয়ানকে সর্বোচ্চ নেতার সাথে করমর্দন (হ্যান্ডশেক) করার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। পুরো বৈঠকটি কেবল অডিও বা কথার মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। এর পরপরই প্রেসিডেন্টকে স্থান ত্যাগ করতে বলা হয়।

প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ

এই গোপন বৈঠকের খবর ফাঁসের পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের আগের একটি বক্তব্যের সাথে বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মে মাসে এক বিবৃতিতে পেজেশকিয়ান দাবি করেছিলেন যে, তিনি মুজতবা খামেনির সাথে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত "আন্তরিক পরিবেশে" বৈঠক করেছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, মূল বৈঠকটি ছিল কয়েক মিনিটের এবং অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধরনের নিরাপত্তামূলক আচরণে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বৈঠকের পর নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সাথে আলোচনাকালে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, অন্ধকারে তিনি কেবল একটি কণ্ঠস্বর শুনেছেন, ফলে সেই ব্যক্তিটি সত্যিই মুজতবা খামেনি ছিলেন কি না তা নিয়ে তিনি সংশয়ী। পরবর্তীতে তিনি সর্বোচ্চ নেতার সরকারি বাসভবনে মুখোমুখি দ্বিতীয় বৈঠকের জন্য অনুরোধ জানালেও নিরাপত্তা পরিষদ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

রহস্যের নেপথ্যে: মুজতবা খামেনি কোথায়?

বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) কর্তৃক সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও মুজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার কোনো সাম্প্রতিক ভিডিও বা অডিও বার্তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়ায় দেশের ভেতরে ও বাইরে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোও তার এই আড়ালে থাকার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দৈনিক হামশাহরি-র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অডিও বা ভিডিও বার্তার ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দ, বৈদ্যুতিক গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি এবং কণ্ঠস্বরের রেজোন্যান্স বিশ্লেষণ করে সর্বোচ্চ নেতার সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা শনাক্ত করতে পারে। এ কারণেই মূলত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক গোপনীয়তা অবলম্বন করা হচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

মুজতবা খামেনির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বনেতাদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে:

যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, নতুন সর্বোচ্চ নেতার বেঁচে না থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ।

ইসরায়েল: অন্যদিকে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্র ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মুজতবা খামেনি জীবিত আছেন তবে তিনি অত্যন্ত গোপন আস্তানায় অবস্থান করছেন।

ইরানি প্রশাসন: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জুলাই মাসে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, "আমি এই মেয়াদের মধ্যে মুজতবা খামেনিকে সরাসরি দেখিনি; কেবল হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তা তার সংস্পর্শে যেতে পেরেছেন।"

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পশ্চিমা গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে ইরান তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে সুরক্ষায় নজিরবিহীন কৌশল গ্রহণ করেছে, যা একই সাথে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেও এক ধরনের ধোঁয়াশা ও সংশয় তৈরি করছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ