মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

হত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত; একই মামলায় সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবেরও মৃত্যুদণ্ড

বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ড দিল সিরিয়ার আদালত



বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ড দিল সিরিয়ার আদালত

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের একটি আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ এবং সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বাশার ও মাহেরের বিচার হয়েছে তাঁদের অনুপস্থিতিতে, আর নাজিব আদালতে উপস্থিত থেকে বিচারের মুখোমুখি হন।

আদালতের রায়ে বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে শিশুদেরসহ একাধিক ব্যক্তিকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার পাশাপাশি নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের অধীনে সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম এমন রায়।

আসাদের চাচাতো ভাই ও সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে গত বছরের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সশস্ত্র বিরোধী বাহিনী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হলে বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ রাশিয়ার মস্কোয় পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তাঁর শাসনের অবসান ঘটে।

১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া বাশার ২০০০ সালে তাঁর বাবা হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। দীর্ঘ শাসনামলে তিনি দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবারের প্রভাব এবং আলাওয়াইট সম্প্রদায়ের আধিপত্য বজায় রাখেন। একই সময়ে সিরিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয় এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বৈরিতা আরও গভীর হয়।

২০১১ সালের মার্চে আরব বসন্তের প্রভাবে সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে আসাদ সরকারের বাহিনী কঠোরভাবে তা দমন করে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সশস্ত্র বিদ্রোহ ও দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

রাশিয়া ও ইরান আসাদ সরকারকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেয়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে সিরিয়ার ভিন্ন ভিন্ন বিরোধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন করে।

১৪ বছর ধরে চলা সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে আবাসিক এলাকা, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো। আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে নির্বিচারে আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের তদন্তকারীদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সিরিয়ার সরকারি আটককেন্দ্রগুলোতে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও জোরপূর্বক গুমের একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত চিত্র উঠে এসেছে।

আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শারা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও আসাদ সরকারের অনুগতদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে নতুন সরকারের আমলেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে আলাওয়াইট অধ্যুষিত উপকূলীয় অঞ্চলে গত বছর ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই সহিংসতায় প্রায় ১,৫০০ আলাওয়াইট নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশটিতে প্রায় এক দশক অবস্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আল-শাদ্দাদি এবং দক্ষিণের আল-তানফ ঘাঁটিও রয়েছে।

এদিকে সিরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার ফলে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে রুশ সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। হুমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে।

বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের এই রায় সিরিয়ার ক্ষমতার পালাবদরের পর বিচারিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তিনি বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করায় রায়টি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

অন্যদিকে, সাবেক সরকারের কর্মকর্তাদের বিচারের পাশাপাশি নতুন সরকারের আমলে সংঘটিত সহিংসতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে কি না—সিরিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিষয় : মৃত্যুদণ্ড সিরিয়ার

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬


বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ড দিল সিরিয়ার আদালত

প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের একটি আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ এবং সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বাশার ও মাহেরের বিচার হয়েছে তাঁদের অনুপস্থিতিতে, আর নাজিব আদালতে উপস্থিত থেকে বিচারের মুখোমুখি হন।

আদালতের রায়ে বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে শিশুদেরসহ একাধিক ব্যক্তিকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার পাশাপাশি নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের অধীনে সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম এমন রায়।

আসাদের চাচাতো ভাই ও সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে গত বছরের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সশস্ত্র বিরোধী বাহিনী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হলে বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ রাশিয়ার মস্কোয় পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা তাঁর শাসনের অবসান ঘটে।

১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া বাশার ২০০০ সালে তাঁর বাবা হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। দীর্ঘ শাসনামলে তিনি দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবারের প্রভাব এবং আলাওয়াইট সম্প্রদায়ের আধিপত্য বজায় রাখেন। একই সময়ে সিরিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয় এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বৈরিতা আরও গভীর হয়।

২০১১ সালের মার্চে আরব বসন্তের প্রভাবে সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে আসাদ সরকারের বাহিনী কঠোরভাবে তা দমন করে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সশস্ত্র বিদ্রোহ ও দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

রাশিয়া ও ইরান আসাদ সরকারকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সমর্থন দেয়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময়ে সিরিয়ার ভিন্ন ভিন্ন বিরোধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন করে।

১৪ বছর ধরে চলা সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে আবাসিক এলাকা, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো। আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে নির্বিচারে আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের তদন্তকারীদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সিরিয়ার সরকারি আটককেন্দ্রগুলোতে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও জোরপূর্বক গুমের একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত চিত্র উঠে এসেছে।

আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শারা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও আসাদ সরকারের অনুগতদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে নতুন সরকারের আমলেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে আলাওয়াইট অধ্যুষিত উপকূলীয় অঞ্চলে গত বছর ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই সহিংসতায় প্রায় ১,৫০০ আলাওয়াইট নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশটিতে প্রায় এক দশক অবস্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আল-শাদ্দাদি এবং দক্ষিণের আল-তানফ ঘাঁটিও রয়েছে।

এদিকে সিরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার ফলে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে রুশ সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। হুমেইমিম বিমানঘাঁটি ও তারতুস নৌঘাঁটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে।

বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের এই রায় সিরিয়ার ক্ষমতার পালাবদরের পর বিচারিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তিনি বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করায় রায়টি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

অন্যদিকে, সাবেক সরকারের কর্মকর্তাদের বিচারের পাশাপাশি নতুন সরকারের আমলে সংঘটিত সহিংসতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে কি না—সিরিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ