২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ভারতে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতার শিকার হয়ে অন্তত ১৩ জন মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন। 'ইন্ডিয়া পার্সিকিউশন ট্র্যাকার' (আইপিটি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তান্ডব, পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নিপীড়নের এক ভয়াবহ চিত্র। বিহার, উত্তরপ্রদেশসহ আটটি রাজ্যে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটেছে।
সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন পরিচালিত 'ইন্ডিয়া পার্সিকিউশন ট্র্যাকার' (আইপিটি) এর উপাত্ত অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধে (Hate Crimes) নিহত ১৩ জনের মধ্যে দুইজন নারী, ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর এবং ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ রয়েছেন। এছাড়া গণপিটুনির শিকার এক ব্যক্তির স্ত্রী শোকে ও অপমানে আত্মহত্যা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজ্যভিত্তিক সহিংসতার চিত্র:
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিহারে সবচাইতে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ৪ জন নিহত এবং ১টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর পরেই রয়েছে ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের নাম। ভারতের অন্তত ১২টি রাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সাম্প্রদায়িক গণসহিংসতা এবং ১৮টি রাজ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপরও বৈরিতা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
রাষ্ট্রীয় শক্তির ভূমিকা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড:
আইপিটি কেবল উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নয়, বরং পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর হাতে অন্তত ৪ জন মুসলিমের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের "কঠোর পদক্ষেপের" আহ্বানের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুই ভাইকে পৃথক পুলিশ 'এনকাউন্টারে' হত্যা করা হয়। এছাড়া জম্মু-কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিতর্কিত এনকাউন্টারে এক ব্যক্তি এবং দিল্লিতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে একজনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।
ধর্মীয় আচার পালনে বাধা ও গ্রেপ্তার:
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রমজান ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের কারণে ৪০ জনেরও বেশি মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মোহাম্মদগঞ্জে একটি খালি বাড়িতে জুমার নামাজ পড়ার অপরাধে ১২ জনকে এবং গঙ্গায় নৌকায় ইফতার করার সময় বিরিয়ানি খাওয়ার কথিত অভিযোগে ১৪ জন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ ৫ কোটি মানুষ:
সবচাইতে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ভারতের ১৩টি রাজ্যে বিশেষ সংশোধনীর (SIR) নামে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এতে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা ২৭ শতাংশ হলেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের মধ্যে ৩৪ শতাংশই মুসলিম। কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকায় এই হার ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত।
বিদ্বেষ ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ:
প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনি ভাষণে 'অনুপ্রবেশকারী' শব্দের ব্যবহার এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটি সরাসরি "বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্য করে" করা হচ্ছে বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারতে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম, দলিত এবং আদিবাসীদের ওপর পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে বিচার পেতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মূল অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা না করে উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই এফআইআর দায়ের করার অভিযোগ উঠেছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
২০২৪ এবং ২৫ সালেও ভারতে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এবং ধর্মীয় উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তজনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের এই রিপোর্টটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির সমন্বয়ে এই বিদ্বেষমূলক অপরাধ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ এবং এই পরিসংখ্যান ভারতের সামাজিক সম্প্রীতির ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ভারতে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতার শিকার হয়ে অন্তত ১৩ জন মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন। 'ইন্ডিয়া পার্সিকিউশন ট্র্যাকার' (আইপিটি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তান্ডব, পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নিপীড়নের এক ভয়াবহ চিত্র। বিহার, উত্তরপ্রদেশসহ আটটি রাজ্যে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটেছে।
সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন পরিচালিত 'ইন্ডিয়া পার্সিকিউশন ট্র্যাকার' (আইপিটি) এর উপাত্ত অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধে (Hate Crimes) নিহত ১৩ জনের মধ্যে দুইজন নারী, ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর এবং ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ রয়েছেন। এছাড়া গণপিটুনির শিকার এক ব্যক্তির স্ত্রী শোকে ও অপমানে আত্মহত্যা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজ্যভিত্তিক সহিংসতার চিত্র:
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিহারে সবচাইতে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ৪ জন নিহত এবং ১টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর পরেই রয়েছে ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের নাম। ভারতের অন্তত ১২টি রাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সাম্প্রদায়িক গণসহিংসতা এবং ১৮টি রাজ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপরও বৈরিতা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
রাষ্ট্রীয় শক্তির ভূমিকা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড:
আইপিটি কেবল উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নয়, বরং পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর হাতে অন্তত ৪ জন মুসলিমের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের "কঠোর পদক্ষেপের" আহ্বানের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুই ভাইকে পৃথক পুলিশ 'এনকাউন্টারে' হত্যা করা হয়। এছাড়া জম্মু-কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিতর্কিত এনকাউন্টারে এক ব্যক্তি এবং দিল্লিতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে একজনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।
ধর্মীয় আচার পালনে বাধা ও গ্রেপ্তার:
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রমজান ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের কারণে ৪০ জনেরও বেশি মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মোহাম্মদগঞ্জে একটি খালি বাড়িতে জুমার নামাজ পড়ার অপরাধে ১২ জনকে এবং গঙ্গায় নৌকায় ইফতার করার সময় বিরিয়ানি খাওয়ার কথিত অভিযোগে ১৪ জন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ ৫ কোটি মানুষ:
সবচাইতে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ভারতের ১৩টি রাজ্যে বিশেষ সংশোধনীর (SIR) নামে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এতে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা ২৭ শতাংশ হলেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াদের মধ্যে ৩৪ শতাংশই মুসলিম। কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকায় এই হার ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত।
বিদ্বেষ ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ:
প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনি ভাষণে 'অনুপ্রবেশকারী' শব্দের ব্যবহার এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটি সরাসরি "বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্য করে" করা হচ্ছে বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারতে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম, দলিত এবং আদিবাসীদের ওপর পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে বিচার পেতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মূল অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা না করে উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই এফআইআর দায়ের করার অভিযোগ উঠেছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
২০২৪ এবং ২৫ সালেও ভারতে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এবং ধর্মীয় উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তজনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের এই রিপোর্টটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির সমন্বয়ে এই বিদ্বেষমূলক অপরাধ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ এবং এই পরিসংখ্যান ভারতের সামাজিক সম্প্রীতির ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন