ইলেকট্রিশিয়ানের উচ্চবেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে প্রতারণামূলক চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধে পাঠায় এক আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র। ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার তরুণ আল মামুন (২৪)। অর্থাভাব দূর করা ও পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর স্বপ্নে সাড়ে ৮ লাখ টাকা ঋণ করে রাশিয়ায় গিয়ে নির্মম প্রতারণার শিকার হন তিনি। একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবককে হারিয়ে দিশেহারা পরিবার এখন সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছে মামুনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ও প্রতারক চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য।
ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করা ২৪ বছর বয়সী তরুণ আল মামুন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। চার বছর বয়সী ছেলে ও মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শিশুকন্যা, স্ত্রী এবং বৃদ্ধা মাকে রেখে গত ৭ মে উন্নত ভবিষ্যতের আশায় রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন তিনি। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মানব পাচারকারী চক্র ও স্থানীয় দালালদের জঘন্য প্রতারণার শিকার হন তিনি সহ আরও অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশী যুবক।
রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের ব্যাংক কার্ড ও আকামা দেওয়ার অজুহাতে রুশ ভাষায় লিখিত কিছু নথিপত্রে জোরপূর্বক সই করিয়ে নেওয়া হয়। ভাষাগত জটিলতার কারণে ওই চুক্তির বিষয়বস্তু বুঝতে পারেননি তারা। পরে জানা যায়, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তিপত্র। মাত্র ১০ থেকে ২১ দিনের সাময়িক সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বিপজ্জনক সম্মুখসারিতে পাঠায় রুশ বাহিনী।
মামুনের সাথে একই ফ্লাইটে যাওয়া ও পরবর্তীতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত অবস্থায় পালিয়ে আসা ঝিনাইদহের যুবক রাজন হোসেনের ভাষ্যমতে, গত ১২ জুন তাঁদের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয় এবং ১৪ জুন ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলা ও মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ১৭ জন বাংলাদেশী নিহত হন। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট স্ত্রী মহিমা আক্তারের কাছে পাঠানো এক ভয়েস বার্তায় মামুন জানিয়েছিলেন, তাঁর মাথার ওপর অবিরাম ড্রোন ঘুরছে এবং যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো বিপদ ঘটতে পারে। এর কিছুদিন পরই ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় নির্মমভাবে মারা যান মামুন। ৮ সেপ্টেম্বর এ খবর পৌঁছায় নান্দাইলের বাড়িতে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মামুনকে বিদেশে পাঠাতে ব্র্যাক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ, ধানের ওপর প্রায় ৪ লাখ টাকা দাদন এবং গরু বিক্রি করে মোট সাড়ে ৮ লাখ টাকা জোগাড় করা হয়েছিল। 'জাবাল-এ নূর' নামক একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে এই ভিসা প্রসেসিং করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, জাবাল-এ নূর ও স্থানীয় দালাল চক্র আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও প্রতারণার সাথে সরাসরি জড়িত।
বর্তমানে এই পরিবারটির মাথার ওপর ঋণের পাহাড়, কিন্তু আয় করার আর কেউ নেই। এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, স্বজনদের লিখিত আবেদন পেলে জেলা প্রশাসন ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লাশ ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক চেষ্টা চালানো হবে। কওমি টাইমসের পক্ষ থেকে এই ধরনের মানব পাচারকারী দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আন্তর্জাতিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে মুসলিম ও সাধারণ তরুণদের ফাঁদে ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারির দাবি জানানো হচ্ছে।
মতামত